ছবি: সংগৃহীত
খুব কমক্ষেত্রেই যুদ্ধে কোনো এক পক্ষ স্পষ্টভাবে জয়ী হয় না, আর বেশিরভাগ সময়েই সবথেকে বেশি মূল্য চোকাতে হয় সাধারণ মানুষকে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার আর সরবরাহ ব্যবস্থা যখন বিপর্যস্ত, পৃথিবীর কিছু দেশ তখন তৈরি হচ্ছে কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে। তবে এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই কিছু দেশ আবার নতুন করে কৌশলগত সুযোগ খুঁজছে।
ইরানের ওপরে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চল এবং সারাবিশ্ব জুড়েই নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে, আর মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই হাজার হাজার মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরেও এর প্রভাব পড়ছে। কোথাও তেলের দাম বেড়ে গেছে, কোথাও আবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় সাধারণ ক্রেতা এবং ব্যবসায়ীদের খরচও বেড়ে গেছে।
তবে এই আলোড়নের ফলে কোন দেশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, কারাই বা লাভবান হবে?
রাশিয়া
ইরান রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশ, আবার তাদের সামরিক সহযোগীও। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির হত্যার ঘটনা রাশিয়ার আরও একটি কূটনৈতিক পরাজয়।
এর আগে মস্কোর ঘনিষ্ঠ সিরিয়ার বাসার আল-আসাদের পতন এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার পরে খামেনির হত্যার পরে রাশিয়া আবারও সেরকমই একটা পরিস্থিতিতে পড়েছে।
তবে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের ফলে রাশিয়া কিছুটা লাভবান হবে ইউক্রেন যুদ্ধে, কারণ মার্কিন সামরিক রসদ এখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কাজে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্যারিস ইনস্টিটিউট অফ পলিটিক্যাল সায়েন্সের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেওস্কি বিবিসির রাশিয়ান বিভাগকে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, প্যাট্রিয়ট মিসাইল আর মিসাইলরোধী অস্ত্রের মজুত কমে আসায় রাশিয়ার সুবিধা হবে, কারণ ইউক্রেন যে ক্ষেপণাস্ত্র বাজার থেকে কিনতে পারত, তা সংকুচিত হয়ে গেছে।
আবার ইরানের 'শাহেদ' ড্রোন এখন আরও বেশি সংখ্যায় তাদের নিজেদেরই প্রয়োজন, কিন্তু তার ফলে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সেই ড্রোন ব্যবহারের ওপরে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ইউক্রেন যুদ্ধের গোড়ার দিকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ইরানের ওপরে সামরিক সহযোগিতার জন্য নির্ভর করত রাশিয়া। সেটা ২০২২-২৩ সাল। সেই সময়ে শাহেদ ড্রোন দিয়েছিল ইরান। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ওই ড্রোন তৈরির কৌশল আর লাইসেন্সও দিয়ে দিয়েছিল তারা, বিবিসিকে বলেন সেন্টার ফর নন-প্রলিফারেশন স্টাডিজের ইউরেশিয়া অঞ্চলের পরিচালক হানা নোট।
তিনি বলেন, এখন এমন একটা পর্যায়ে যুদ্ধটা পৌঁছে গেছে, যেখানে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চালানোর জন্য রাশিয়ার আর ইরানকে প্রয়োজন নেই। শাহেদ ড্রোন এখন রাশিয়া নিজেই তৈরি করতে পারে।
বুধবার থাইল্যান্ডের একটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময়ে সেটির ওপরে হামলা হয়
আবার, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে যেভাবে জ্বালানি তেল আর গ্যাসের দাম অত্যধিক বাড়ছে, সেখান থেকেও রাশিয়ার কিছুটা আর্থিক সাশ্রয় হতে পারে। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে রাশিয়া বেশ ভালো রকম অর্থনৈতিক টানাটানিতে আছে।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় বাজেট নির্ভর করে দেশটির তেল রফতানির ওপরে। তারা ব্যারেল প্রতি ৫৯ ডলারে তেল রফতানি করত, কিন্তু এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১২০ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল একলাফে। ওদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল শোধনাগারগুলো তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। তাই রাশিয়া এখন চীন আর ভারতের মতো বড় বাজারে আরও তেল রফতানি করতে পারে।
রাশিয়া থেকে তেল কেনার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার জন্য আগে ভারতকে বলা হচ্ছিল, কিন্তু কয়েকদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র তাতে ভারতকে কিছুটা ছাড় দিয়েছে, অন্তত আগামী মাসের জন্য, বলেন আন্তর্জাতিক শক্তি ও পণ্য বাজারের তথ্য সংগ্রহ করে, এমন একটি সংস্থা 'আর্গাস'- এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ফাইফ।
চীন
ইরান যুদ্ধের কারণে চীনের ওপরে এখনো কোনো বড়ো প্রভাব পড়েনি, কিন্তু তবুও তারা চাপটা অনুভব করবে। সেন্টার ফর গ্লোবাল এনার্জি পলিসির তথ্য অনুযায়ী চীন যে পরিমাণ তেল আমদানি করে, তার মাত্র ১২ শতাংশ ইরান থেকে।
আবার চীন বেশ কয়েকমাস চলার মতো তেল ইতোমধ্যেই মজুত করে রেখেছে, আর তার পরে সহজেই তারা রাশিয়ার সহায়তা চাইতেই পারে।
ফাইফ বলেন, তবে তাদের রফতানি-নির্ভর শিল্প ক্ষেত্রে আঘাত আসবে।
চীনের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ২০ শতাংশ আসে রফতানি থেকে। জমির দামে অতিমন্দা আর ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় হ্রাস পাওয়ার কারণে আগে থেকেই ধুঁকছে চীনের অর্থনীতি। তাই রফতানিই হয়ে উঠেছে তাদের অর্থনীতিকে সচল রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
হরমুজ প্রণালি ও তার আশপাশের অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় অবশ্য চীনের খুব একটা সমস্যা হবে না – কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে চীনের উৎপাদিত পণ্য পাঠানোর জন্য তাদের আটলান্টিক অঞ্চলে পৌঁছনোটা খুব জরুরি।
আবার আরব উপদ্বীপের অন্যদিকে বাব এল-মান্দেব প্রণালী, যেটি ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে, সেখানে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ইয়েমেন-ভিত্তিক হুতিরা কয়েকটি হামলা চালিয়েছে।
ফাইফ বিবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল আবারও ভালোমতো বিঘ্নিত হবে। দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে যে-সব জাহাজ এশিয়া থেকে আটলান্টিকের দিকে যেতে চায়, তাদের আফ্রিকার দক্ষিণে কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যেতে হবে।
লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের বিশেষজ্ঞ নিল ক্যুইলিয়াম বলছিলেন, এতে খরচ অনেক বাড়বে।
এই যাত্রাপথে ১০ থেকে ১৪ দিন বেশি সময় লাগবে। পণ্যের ওপরে নির্ভর করে গড়ে একেকটি জাহাজের অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ ডলার খরচ হবে, বলছিলেন ক্যুইলিয়াম।
ইরান যুদ্ধ চীনের জন্য কূটনৈতিক সুযোগ গড়ে দিতে পারে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসের ইনস্টিটিউটের ফিলিপ শেল্টার-জোনস্ বলছেন, চীন তো যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে একটা পাল্টা ভারসাম্যের নীতি নিয়ে চলে বলে নিজেদের তুলে ধরে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপরীতে এমন একজন বৈশ্বিক নেতা হিসেবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজের ভাবমূর্তি তুলে ধরেন, যার নীতি অনুমান করা যায়।
আর এই সংঘাত থেকে বেইজিং এই শিক্ষাও নিতে পারে যে তাইওয়ানের মতো অন্যান্য বিতর্কিত ইস্যুতে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া কী ধরণের হতে পারে।
উন্নয়নশীল দেশেগুলোর অর্থনীতি
মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপরে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ইরান যুদ্ধের ফলে বড়সড় ধাক্কার সম্মুখীন হতে চলেছে।
কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই খরচ কমানোর জন্য কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা আশা করছে যে যদি ওইসব পদক্ষেপ নিয়ে যুদ্ধের কারণে তাদের ওপরে এসে পড়া অর্থনৈতিক প্রভাব দ্রুত সামলাতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পরেই ভিয়েতনামে ডিজেলের দাম ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার সবাইকে বলছে, যদি সম্ভব হয় তাহলে বাড়ি থেকেই কাজ করতে।
ফিলিপিন্স ৯৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেলই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। জরুরি বিভাগ ছাড়া অন্যান্য সরকারি কর্মচারীরা এখন সপ্তাহে চার দিন কাজ করছেন।
একই ধরনের বিধিনিষেধ চালু করা হয়েছে পাকিস্তানেও। তবে ব্যাংক কর্মচারীদেরও সেখানে ছাড় দেওয়া হয়েছে। যেখানেই সম্ভব, সেখানে বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নেওয়া হচ্ছে অনলাইনে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ টেলিভিশনের প্রচারিত এক ভাষণে বলেছেন যে দেশের জ্বালানির মজুদ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে তেল খরচ করতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা করতে শুরু করেছে, সরকারকে তার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পেট্রোল পাম্পগুলিতে দীর্ঘ লাইন হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণও চালু হয়েছে – গাড়ির জন্য দিনে ১০ লিটার, আর মোটরসাইকেলের জন্য মাত্র দুই লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে।
তবে যুদ্ধের পরিণতি শুধুই জ্বালানির ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বিশ্বজুড়ে কৃষকরা তাদের জমিতে যে সার ব্যবহার করেন, তার সরবরাহ বিঘ্নিত হলে খাদ্য নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
ক্যুইলিয়াম বিবিসি নিউজকে বলেছেন, সার উৎপাদনে যে ইউরিয়া ব্যবহৃত হয়, তার ৩০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজে করে যায়। অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে পেট্রোকেমিকাল তৈরি হয়, তা থেকে ইউরিয়া আসে। অর্থাৎ আপনি যদি বিশ্ব বাজার থেকে ৩০ শতাংশ ইউরিয়া যদি সরিয়ে নেন, তাহলে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব তো পড়বেই।
জ্বালানি তেল নিতে বাংলাদেশের এক ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন
বিশ্বের অন্যতম সব থেকে বড় গ্যাস রফতানিকারক ও সারের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরিয়া উৎপাদন করে যারা, সেই 'কাতারএনার্জি'র শোধনাগারে হামলার পরে তারা জরুরি ভিত্তিতে উৎপাদন আর সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
ক্যালসিয়াম বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তা, মুদ্রাস্ফীতি এসবের ওপরে প্রভাব লক্ষ্য করা যাবে এখন থেকে আরও ছয় থেকে নয় মাস পরে। এখনই না হলেও, কৃষকদের কাছে যখন সার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়বে, ফসল বাঁচানো শক্ত হয়ে উঠবে, তখন আমরা একটা সুদূর প্রসারী প্রভাব দেখতে পাব।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



