ছবি: সংগৃহীত
পুরান ঢাকার খাবারের ঐতিহ্য নিয়ে কথা উঠলেই যে কয়েকটি নাম সবচেয়ে আগে উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে অন্যতম হাজী বিরিয়ানি ও হানিফ বিরিয়ানি। কয়েক দশক ধরে এই দুটি নাম শুধু খাবারের দোকান হিসেবেই নয়, বরং ঢাকার একটি স্বতন্ত্র খাদ্য সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পুরান ঢাকার সরু গলি, ভিড়ভাট্টা আর ব্যস্ত রাস্তার মাঝেই তৈরি হয়েছে তাদের জনপ্রিয়তার ইতিহাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ এখানে এসে বিরিয়ানির স্বাদ নিয়ে যাচ্ছে, আর সেই স্বাদের গল্প ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার বাইরে দেশজুড়েও।
বিশেষ করে রমজান মাস এলেই পুরান ঢাকার খাবারের দৃশ্য যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। ইফতারের সময় কিংবা গভীর রাতের সেহরিতে হাজী ও হানিফ বিরিয়ানির দোকানগুলোর সামনে মানুষের ভিড় যেন উৎসবের আবহ তৈরি করে। অনেকেই পরিবার নিয়ে বা বন্ধুদের সঙ্গে এখানে এসে বিরিয়ানি খেতে পছন্দ করেন। কেউ কেউ আবার দূর-দূরান্ত থেকে শুধু এই বিখ্যাত বিরিয়ানির স্বাদ নেওয়ার জন্য পুরান ঢাকায় ছুটে আসেন।
যদিও দুটি দোকানই বিরিয়ানির জন্য বিখ্যাত, তবে স্বাদ, রান্নার ধরন, মসলার ব্যবহার এবং পরিবেশনের দিক থেকে তাদের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যের কারণেই অনেক বিরিয়ানিপ্রেমীর মধ্যে প্রায়ই আলোচনা ওঠে—হাজী বিরিয়ানি আর হানিফ বিরিয়ানির বিশেষত্ব আসলে কোথায়।
হাজী বিরিয়ানি: পুরান ঢাকার এক ঐতিহ্য
পুরান ঢাকার খাবারের ইতিহাসে হাজী বিরিয়ানি এক কিংবদন্তির নাম। এর প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৩৯ সালে। প্রতিষ্ঠাতা হাজী মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন ছিলেন পেশায় একজন দক্ষ বাবুর্চি। কথিত আছে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করার সময় বিশেষ ধরনের বিরিয়ানি রান্নার কৌশল শিখেছিলেন। দেশে ফিরে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার এলাকায় একটি ছোট দোকান দিয়ে বিরিয়ানি বিক্রি শুরু করেন।
শুরুর দিকে দোকানটি ছিল খুবই সাধারণ। কয়েকটি বড় হাঁড়ি, কিছু কাঠের বেঞ্চ আর সীমিতসংখ্যক ক্রেতা—এভাবেই শুরু হয়েছিল হাজী বিরিয়ানির যাত্রা। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এর স্বাদ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে ক্রেতার সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং দোকানটি পুরান ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় খাবারের ঠিকানায় পরিণত হয়।
হাজী বিরিয়ানির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সরলতা এবং স্বাদের ভারসাম্য। এখানে সাধারণত খাসির মাংস ব্যবহার করা হয় এবং মাংসের টুকরাগুলো তুলনামূলক ছোট হয়। অনেকেই বলেন, এই বিরিয়ানির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে তেলের ব্যবহার কম। ফলে এটি খেতে তুলনামূলক হালকা লাগে এবং অতিরিক্ত ভারী অনুভূতি তৈরি করে না।
মসলার ব্যবহারও এখানে বেশ পরিমিত। দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গসহ বিভিন্ন গরম মসলা ব্যবহার করা হলেও সেগুলোর স্বাদ খুব বেশি তীব্র নয়। বরং মাংসের স্বাভাবিক স্বাদ এবং চালের সুগন্ধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই কারণে অনেকেই হাজী বিরিয়ানিকে ‘মাইল্ড ফ্লেভার’ বা নরম স্বাদের বিরিয়ানি হিসেবে উল্লেখ করেন।
আরেকটি বিষয় হাজী বিরিয়ানিকে আলাদা করে তোলে—এতে সাধারণত আলু বা ডিম দেওয়া হয় না। ঢাকার অনেক বিরিয়ানিতে আলু বা ডিম দেখা গেলেও হাজী বিরিয়ানিতে সেই প্রচলন নেই। এর ফলে চাল, মাংস ও মসলার স্বাদই এখানে মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
রান্নার পদ্ধতিও এখানে বেশ ঐতিহ্যবাহী। বড় বড় হাঁড়িতে নির্দিষ্ট অনুপাতে চাল, মাংস ও মসলা একসঙ্গে দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়। এই ধীর রান্নার কারণে চাল ও মাংসের স্বাদ একে অপরের সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায় এবং তৈরি হয় আলাদা ধরনের সুগন্ধ ও স্বাদ।
রমজান মাসে হাজী বিরিয়ানির দোকানের সামনে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা অনেকটা উৎসবের মতো। ইফতারের আগেই দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। কেউ পরিবার নিয়ে বিরিয়ানি কিনে বাড়িতে নিয়ে যান, আবার কেউ দোকানের ভেতরেই বসে খেতে চান। ইফতারের পরও দোকানের ভিড় কমে না, বরং রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেহরির সময় পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় অব্যাহত থাকে।
পুরান ঢাকার অনেক তরুণের কাছে সেহরির সময় হাজী বিরিয়ানি খাওয়া এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অনেকেই রাতভর আড্ডা শেষে এখানে এসে বিরিয়ানি খেয়ে সেহরি করেন। ফলে রমজানের রাতগুলোতে দোকানটির আশপাশে এক বিশেষ প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়।
হানিফ বিরিয়ানি: তীব্র স্বাদের জনপ্রিয়তা
পুরান ঢাকার আরেক জনপ্রিয় নাম হানিফ বিরিয়ানি। তুলনামূলকভাবে এটি নতুন হলেও জনপ্রিয়তার দিক থেকে খুব দ্রুতই বড় জায়গা দখল করে নিয়েছে। এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ হানিফ নব্বইয়ের দশকে পুরান ঢাকায় একটি ছোট দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন।
শুরুর দিকে দোকানটি খুব ছোট পরিসরে পরিচালিত হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এর বিরিয়ানির স্বাদ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্রেতাদের চাহিদা বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে দোকানের পরিসর বাড়ানো হয়। বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এই নামে একাধিক শাখা রয়েছে।
হানিফ বিরিয়ানির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর তীব্র ও সমৃদ্ধ স্বাদ। অনেকেই একে ‘রিচ ফ্লেভার’ বা ভারী স্বাদের বিরিয়ানি বলে থাকেন। এখানে তেলের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি, ফলে বিরিয়ানির চাল ঝরঝরে হলেও স্বাদ অনেক বেশি গভীর ও ভারী মনে হয়।
মসলার ব্যবহারও এখানে বেশি তীব্র। গরম মসলার ঘ্রাণ, মাংসের ঝোলের ঘনত্ব এবং চালের সঙ্গে মসলার মিশ্রণ—সব মিলিয়ে এটি বেশ শক্তিশালী স্বাদের বিরিয়ানি তৈরি করে। অনেক ক্রেতার কাছে এই তীব্র স্বাদই হানিফ বিরিয়ানির প্রধান আকর্ষণ।
হানিফ বিরিয়ানিতে সাধারণত মাংসের টুকরাগুলো ছোট হয় এবং অনেক সময় এর সঙ্গে আলুও দেওয়া হয়। এতে করে এক প্লেট বিরিয়ানি তুলনামূলক ভারী হয়ে ওঠে। যারা পেট ভরে খেতে পছন্দ করেন, তাদের কাছে এই বিরিয়ানি বেশ জনপ্রিয়।
রমজান মাসে হানিফ বিরিয়ানির দোকানগুলোর সামনেও প্রচণ্ড ভিড় দেখা যায়। ইফতারের আগে থেকেই অনেক মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। অফিস শেষে অনেকেই সরাসরি এখানে এসে বিরিয়ানি কিনে বাড়িতে নিয়ে যান।
ইফতারের পর তরুণদের মধ্যে এখানে বসে বিরিয়ানি খাওয়ার প্রবণতাও বেশ বেশি। রাত গভীর হলেও দোকানগুলোতে ক্রেতার আনাগোনা বন্ধ হয় না। সেহরির সময়েও এখানে মানুষের ভিড় দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, সেহরির জন্য ভারী খাবার হিসেবে হানিফ বিরিয়ানি বেশ উপযোগী, কারণ এটি খেলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে।
স্বাদের দিক থেকে অনেকেই হানিফ বিরিয়ানিকে ‘বোল্ড ফ্লেভার’ বা তীব্র স্বাদের বিরিয়ানি হিসেবে বর্ণনা করেন। যারা বেশি মসলাদার ও তেলযুক্ত খাবার পছন্দ করেন, তাদের কাছে এটি বিশেষ আকর্ষণীয়।
দুই ভিন্ন স্বাদের ঐতিহ্য
সব মিলিয়ে বলা যায়, হাজী বিরিয়ানি ও হানিফ বিরিয়ানি—দুটোই ঢাকার খাবারের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদিও দুটির মূল খাবারই বিরিয়ানি, তবুও তাদের স্বাদ, রান্নার ধরন এবং পরিবেশনের ধরণে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
হাজী বিরিয়ানিতে যেখানে পাওয়া যায় সরলতা, কম তেল এবং পরিমিত মসলার স্বাদ, সেখানে হানিফ বিরিয়ানিতে পাওয়া যায় তীব্র মসলা, সমৃদ্ধ স্বাদ এবং তুলনামূলক ভারী খাবারের অভিজ্ঞতা।
এই ভিন্নতাই দুটি দোকানকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। কেউ পছন্দ করেন হাজীর নরম ও পরিমিত স্বাদ, আবার কেউ খুঁজে পান হানিফের শক্তিশালী ও তীব্র স্বাদের আনন্দ। আর এই দুই স্বাদের সহাবস্থানই ঢাকার বিরিয়ানি সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



