ছবি: সংগৃহীত
দুপুরজুড়ে ছিল আনন্দ, হাসি আর উৎসবের আবহ। দুই পরিবারের আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে নতুন জীবনের পথে পা রাখেন সাব্বির ও মিতু। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, শুভেচ্ছা আর স্বজনদের আশীর্বাদে মুখর হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই সেই আনন্দ মুছে গিয়ে জায়গা নেয় হৃদয়বিদারক শোক। বিকেলের এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নবদম্পতিসহ অন্তত ১৩ জনের প্রাণ ঝরে যায়।
ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের বেলাই ব্রিজের কাছে। সড়কে একটি বাসের সঙ্গে নবদম্পতি ও তাদের স্বজনদের বহনকারী একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই দুমড়ে-মুচড়ে যায় মাইক্রোবাসটি এবং ঘটনাস্থলেই ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান একে একে ১৩ জন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনার কয়রা উপজেলার নকশা গ্রামে কনের বাড়িতে সাব্বির ও মিতুর বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে সাদামাটা কিন্তু আনন্দঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় তাদের বিয়ে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বিকেলে বর-কনেসহ দুই পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য একটি মাইক্রোবাসে করে রওনা হন বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেলাবুনিয়া গ্রামে, যেখানে সাব্বিরের বাড়ি।
নতুন জীবনের স্বপ্ন আর আনন্দ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তারা। গাড়িতে ছিলেন নবদম্পতি ছাড়াও পরিবারের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও শিশুসন্তানরা। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তাদের যাত্রা থেমে যায় চিরতরে। মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে সাব্বিরের বাড়ি থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে, রামপাল উপজেলার কাছে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় ঘটে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা।
পুলিশ জানায়, একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় মাইক্রোবাসটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেতরে থাকা যাত্রীরা গুরুতরভাবে আহত হন। ঘটনাস্থলেই কয়েকজন নিহত হন এবং আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
কাটাখালী হাইওয়ে থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) কে এম হাসানুজ্জামান জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। গুরুতর আহতদের দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়।
কাটাখালী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাফর আহমেদ দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পরপরই মহাসড়কে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে যান চলাচল স্বাভাবিক করে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মেহনাজ মোশাররফ জানান, দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন সময় হাসপাতালে মরদেহ আনা হয়। হাসপাতালের মর্গে মোট ৯টি মরদেহ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, নৌবাহিনীর একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে সাতটি মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়। এছাড়া অন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তিনজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে দুজন পরে মারা যান এবং অপর একজনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।
অন্যদিকে রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুকান্ত কুমার পাল জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজনের মরদেহ রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশু রয়েছে, যা পুরো ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে।
রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত নিহতদের সবার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি। তবে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রারে এখন পর্যন্ত ৯ জনের নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন—আসাদুর রহমান সাব্বির (২৭), মিতু (২০), পুতুল (৩০), ঐশী (৩০), আলিফ (১২), মো. নাঈম শেখ (২৮), এক বছর বয়সী ফাহিম, দেড় বছর বয়সী ইরাম এবং আনোয়ার বেগম (৪৮)।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে নিহত সাব্বিরের চাচাত ভাই পরিচয় দেওয়া মাজহারুল ইসলাম সোহান জানান, দুপুরে কয়রার নকশা গ্রামে মিতুদের বাড়িতে সাব্বির ও মিতুর বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠান শেষে নবদম্পতি ও পরিবারের সদস্যরা মাইক্রোবাসে করে মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে যাচ্ছিলেন।
তিনি বলেন, তারা নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু রামপালের কাছাকাছি এলাকায় পৌঁছানোর পরই হঠাৎ ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সব আনন্দ শেষ হয়ে যায়।
মোংলা পৌরসভা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খোরশেদ আলম জানান, দুর্ঘটনায় সাব্বিরের বাবা আব্দুর রাজ্জাকও নিহত হয়েছেন। তিনি মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত একজন ব্যক্তি ছিলেন।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। দুই পরিবারের আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়রা হাসপাতালে ছুটে আসেন। যারা কয়েক ঘণ্টা আগেও বিয়ের আনন্দে মেতে ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন হাসপাতালের মর্গের সামনে স্বজন হারানোর শোকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
একই দিনে বিয়ের আনন্দ থেকে হঠাৎ এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা এই দুর্ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কে নিরাপদে চলাচলের বিষয়ে সবাইকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



