ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠন করা বিএনপিকে সংসদে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধীদলীয় জোট। জোটের অংশ হিসেবে তাদের সঙ্গে রয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে গঠিত নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নবনির্বাচিত এমপিরা। সংশ্লিষ্টদের মতে আপাতত তিন ইস্যুতে সংসদে বিএনপিকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে বিরোধীদলীয় জোট। প্রথমত আন্দোলনের ফসল ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে সরকারের ধীরগতি বা কার্যকারিতা নিয়ে জামায়াত প্রশ্ন তুলতে পারে।
দ্বিতীয়ত নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং বর্তমান সরকারি কার্যক্রমের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে তারা কড়া অবস্থান নিতে পারে। তৃতীয়ত সংস্কার ও নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে আগে থেকেই দুই দলের মধ্যে যে মতপার্থক্য ছিল তার প্রতিফলন এখন সংসদীয় বিতর্কে দেখা যেতে পারে।
বিএনপি যখন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে, তখনই সংসদে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য মোকাবিলায় নতুন কৌশল নিচ্ছে বিরোধী জোট। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত বিরোধী জোট সংসদে বিএনপিকে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলার পাশাপাশি রাজপথেও সাংবিধানিক সংস্কারের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করছে।
সরকার ও বিরোধীদলীয় বেশ কয়েকজন এমপি এ ইঙ্গিত দেন।
সরকারি দলের এমপিরা জানান, সংসদ হচ্ছে বিতর্ক ও জবাবদিহির জায়গা। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সরকারি কার্যক্রমের সমালোচনা করা হবে, দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সবকিছু হতে হবে বিধিসম্মতভাবে।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় এমপিরা বলেন, ‘সরকারের ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। দুর্নীতি আর অপশাসন দেখলে আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের কড়া সমালোচনা করা হবে। ক্ষেত্র বিশেষে জনমত তৈরি করা হবে। সরকারের ভুল শুধরে দেশকে এগিয়ে নেওয়াটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।’ সংসদে ডেপুটি স্পিকার পদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে জামায়াত ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা সংসদে গঠনমূলক সমালোচকের ভূমিকা পালন করবে।
এরই অংশ হিসেবে সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির বিভিন্ন নীতি ও প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সংসদের পুরোটা সময় বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল নেবে বিরোধী জোট। এসব প্রসঙ্গে মেহেরপুর-১ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াত দলীয় এমপি মো. তাজউদ্দিন খান বলেন, ‘অধিবেশনের প্রথম দিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আমাদের পরিকল্পনা ছিল। সেটা করা হয়েছে। ২১২ আসন পেয়ে বিএনপি যে স্বাধীনভাবে চলবে সেটা হবে না। দেশ ও জাতির স্বার্থে সংসদের রীতি অনুযায়ী আমাদের গঠনমূলক ও বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকবে।’
একই প্রসঙ্গে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘জামায়াত জোট সংসদে আমাদের চ্যালেঞ্জে রাখুক সেটা আমরা চাই। তারা আমাদের গঠনমূলক সমালোচনা করুক। এতে আমাদের সংশোধনের সুযোগ থাকবে। জাতীয় ইস্যুগুলোতে আমরা ঐকমত্য হব সেটা তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করি। আমরা ভালো কাজ দিয়ে বিরোধী জোটের সব সমালোচনার জবাব দেব।’
এরই মধ্যে সংসদের অধিবেশনের প্রথম দিনেই সে ধরনের নজির দেখিয়েছে জামায়াত জোট। ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার সংসদের প্রথম অধিবেশনে শোক প্রস্তাব উত্থাপন নিয়ে চাপ সৃষ্টি করে জামায়াত জোট। তাদের কৌশলী চাপের মুখে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন দলীয় শীর্ষ নেতার নাম শোক প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করে তারা। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে জানানো প্রতিবাদ বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি স্পিকার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম প্রস্তাবের পর বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংসদে এর মৃদু প্রতিবাদ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘স্পিকারের বিষয়টি আগে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। এটা করা হলে ভালো হতো। রেওয়াজ অনুযায়ী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল নিজেদের পছন্দমতো ব্যক্তিকে স্পিকার হিসেবে মনোনীত করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল বা জোটের সঙ্গে আলোচনার অতীত কোনো রেওয়াজ নেই।
১৩তম সংসদে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ৭৬টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যার মধ্যে জামায়াত একাই পেয়েছে ৬৮টি আসন। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা পালন করছেন এবং তাঁরা বিএনপির নীতিনির্ধারণে সংসদীয় তদারকি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬০ শতাংশের বেশি ভোটার অংশগ্রহণ করে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। বিরোধী জোট এই জনরায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিএনপিকে দ্রুত সংস্কারের পথে হাঁটতে বাধ্য করার কৌশল নিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও সংসদে জামায়াতের মতো একটি সুসংগঠিত বিরোধী দল এবং রাজপথে এনসিপির মতো শক্তিগুলোর চাপের কারণে সরকারকে প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



