ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করা নিয়ে ভারতকে হুমকি দিয়ে তিনি বলেছেন, খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর ‘উল্লেখযোগ্য হারে’ শুল্ক আরোপ করা হবে। এমন ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। নয়াদিল্লি এরই মধ্যে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং বলেছে, তারা ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষায়’ প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
স্থানীয় সময় রোববার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে ভারত বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জন করছে, অথচ ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপারে তাদের কোনো সংবেদনশীলতা নেই। পরে তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশাল’-এ পোস্ট দিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, “রাশিয়া এখন তেল বিক্রি করে যুদ্ধ চালানোর অর্থ জোগাড় করছে। আর ভারত সে তেল কিনে ব্যবসা করছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনে কত মানুষ মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে ভারতের কোনো মাথাব্যথা নেই।”
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “এই কারণেই আমি যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর উল্লেখযোগ্য হারে শুল্ক বসাব।” যদিও ঠিক কত শতাংশ বাড়ানো হবে সে বিষয়ে তিনি তখন স্পষ্ট কিছু বলেননি।
উল্লেখযোগ্য যে, ট্রাম্প প্রশাসন আগেই ঘোষণা দিয়েছিল যে ১ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরেই শুরু হয় বিতর্ক ও উত্তেজনা। এবার সেই উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়ালেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যিনি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় ফিরলে বাণিজ্যনীতিতে আগ্রাসী পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন।
ট্রাম্পের মন্তব্য ও হুমকির কড়া জবাব দিয়েছে ভারত। সোমবার নয়াদিল্লিতে এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, “রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। এ ধরনের আচরণ একেবারেই অযৌক্তিক ও অন্যায্য।” তিনি আরও বলেন, “ভারত একটি স্বাধীন অর্থনীতি এবং আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষার জন্য যেকোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।”
তিনি অভিযোগ করেন, “যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বারবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গিয়ে ভারতের মতো তৃতীয়পক্ষকে চাপে ফেলছে, অথচ বাস্তবতা হলো—রাশিয়ার সঙ্গে বৈধভাবে বাণিজ্য করাই আমাদের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত। এটি কারও হুমকি বা চাপের মাধ্যমে পরিবর্তন হওয়ার নয়।”
ট্রাম্পের অবস্থান শুধু বাণিজ্যিক নয়, তা কূটনৈতিকও। ২০২4 সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন তিনি। একাধিকবার তিনি দাবি করেছেন, “আমি ক্ষমতায় এলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করব।” তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মস্কো-কিয়েভ শান্তি আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করছেন।
এই প্রেক্ষাপটেই তিনি ভারতের পাশাপাশি রাশিয়ার বিরুদ্ধেও আরও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, আগামী শুক্রবারের মধ্যে শান্তি আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না এলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন ও আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হবে।
এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এই সপ্তাহে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো সফরে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরবেন এবং যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চূড়ান্ত বার্তা’ পৌঁছে দেবেন।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, একই সঙ্গে ভারতের ওপর শুল্ক বাড়ানোর হুমকি এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা ট্রাম্পের একধরনের কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল। মার্কিন স্বার্থের বাইরে গেলে কেউই ছাড় পাবে না—এমন বার্তাই দিচ্ছেন তিনি।
ট্রাম্পের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একধরনের ‘সংঘাতের কৌশল’ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ট্রাম্পের লক্ষ্য শুধু ভারতকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনে যারা জড়িত তাদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই এ বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে, কারণ ভারত বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং মার্কিন প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ।
বহু পর্যবেক্ষক আশঙ্কা করছেন, যদি ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যায়, তাহলে সেটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেই বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, এই মুহূর্তে যখন যুক্তরাষ্ট্র চীনবিরোধী জোট গঠনে ভারতের ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে দেওয়া শুল্কছাড়ের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক এক দরকষাকষির মাধ্যমে পাকিস্তানি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় কূটনীতিকরা প্রশ্ন তুলছেন—রাশিয়া থেকে তেল কেনা যদি অপরাধ হয়, তবে পাকিস্তানের সঙ্গেও একই মাপকাঠি প্রয়োগ করা হচ্ছে না কেন?
সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের হুমকি এবং ভারতের প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে উত্তেজনার নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থান আরও তীব্র হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ভারত এ অবস্থায় কোন পথে হাঁটে—সংঘাতের নাকি সমঝোতার। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে শুরু হওয়া এই দ্বন্দ্ব বিশ্ব রাজনীতির পটপরিবর্তনের বার্তা বহন করছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



