ছবি: সংগৃহীত
মানুষ ভুল করে—এটাই মানবিক বাস্তবতা। কখনো আমরা এমন পথে হাঁটি, যা আমাদের হৃদয়কে করে তোলে ভারাক্রান্ত, আত্মাকে করে তোলে আহত। বাহ্যিক হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অপরাধবোধ, অনুশোচনা আর এক অদৃশ্য শূন্যতা। মনে হয়—হৃদয়ে যেন পাপের কাঁটা বিঁধে রক্ত ঝরছে। কিন্তু সুসংবাদ হলো— এই ক্ষত সারানোর জন্য আল্লাহ্ আমাদের একা ছেড়ে দেননি। তিনি নাজিল করেছেন এমন এক কিতাব, যার প্রতিটি আয়াত হৃদয়ের জন্য শিফা, আত্মার জন্য রহমত। সেই কিতাবই হলো পবিত্র কুরআন।
কুরআন: হৃদয়ের শিফা
যে হৃদয় পাপের কারণে অসুস্থ, কুরআনই তার ওষুধ। যে আত্মা ক্লান্ত, কুরআনই তার বিশ্রাম। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ
‘আমি কুরআনে এমন বিষয় নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৮২)
কুরআনের আলোতে হৃদয়ের চিকিৎসা
মানুষ যতই দুনিয়ার আরাম, সম্পর্ক বা সম্পদে শান্তি খুঁজুক—হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি কেবল আল্লাহর স্মরণেই নিহিত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা আর-রাদ: আয়াত ২৮)
পাপ ও অনুশোচনার পরেও আছে আশা
আমরা যখন পাপে ডুবে যাই, তখন শয়তান আমাদের কানে ফিসফিস করে বলে— ‘তোমার আর ফেরার পথ নেই।’ কিন্তু আল্লাহ নিজেই সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছেন এভাবে—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ
‘হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা যুমার: আয়াত ৫৩)
নিয়মিত সালাত ও ইবাদতে ফিরে আসা
যে ব্যক্তি নিয়মিত নামাজে ফিরে আসে, তার হৃদয় ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ
‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আল-আনকাবূত: আয়াত ৪৫)
আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা কর।’ (সুরা আত-তাহরিম: আয়াত ৮)
তাওবা নাসুহা হলো—
- পাপ ছেড়ে দেওয়া
- অনুতপ্ত হওয়া
- ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প
- মানুষের হক নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া
কুরআনুল কারিমের এসব আয়াত ও দিকনির্দেশনা যেন ভাঙা হৃদয়ের ওপর নেমে আসা রহমতের এক পশলা বৃষ্টি।
হাদিসের আলোতে আত্মশুদ্ধির উপায়
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী: হৃদয়ের জন্য দিকনির্দেশনা
নবীজি (সা.)-এর হাদিস আমাদের শেখায়— ভুল নয়, বরং ভুলের পর ফিরে না আসাটাই আসল ক্ষতি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
‘আদম সন্তানের সবাই ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম হলো তারা যারা তাওবা করে।’ (তিরমিজি ২৪৯৯)
গোপনে ইস্তিগফার ও আল্লাহর ভয়
আপনি যখন একা চোখের পানি ফেলে তাওবা করেন—আল্লাহ তা দেখেন এবং ভালোবাসেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
لَلَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ مِنْ أَحَدِكُمْ يَجِدُ ضَالَّتَهُ بِالْفَلاَةِ
‘মরু বিয়াবানে তোমাদের কেউ হারানো (বাহন) পশু পাওয়ার পর যে পরিমাণ খুশী হয় আল্লাহ তাআলা বান্দার তওবার পর এর থেকেও অধিক খুশী হন।’ (মুসলিম ৬৭০০)
ভালো সঙ্গ গ্রহণ করা
পাপ ছাড়তে চাইলে— নেক লোকদের সঙ্গ গ্রহণ করা, কুরআনের মাহফিলে যাওয়া, দ্বীনি পরিবেশে সময় কাটানো অত্যন্ত জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ
‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে।’ (আবু দাউদ ৪৮৩৩)
আপনার হৃদয় যদি আজ ব্যথিত হয়, যদি অতীতের ভুল আপনাকে তাড়া করে ফেরে—তবে জানবেন, আল্লাহ্ এখনো আপনাকে ডাকছেন। কুরআনের দিকে ফিরে আসুন। আজই শুরু হোক নতুন যাত্রা—তাওবা, দুআ আর কুরআনের সান্নিধ্যে। হয়তো একদিন আপনি নিজেই বলবেন— ‘যে হৃদয় একদিন পাপের ভারে রক্তাক্ত ছিল, কুরআনের আলোতেই সে হৃদয় আজ প্রশান্ত।’ ইনশাআল্লাহ।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



