ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি আর দেখতে চাই না। রাজার ছেলে রাজা হবে, রানির মেয়ে রানি হবে যোগ্যতা থাকুক আর না থাকুক—তা আর দেখতে চায় না এ দেশের জনগণ। মেধা থাকলে, যোগ্যতা থাকলে একজন রিকশাওয়ালাও রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারবেন।’
গতকাল শুক্রবার রাতে কুমিল্লা টাউন হল ময়দানে মহানগর জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ ছাড়া গতকাল তিনি নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে পৃথক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ফুটপাত থেকে শুরু করে শিল্পপতি—কেউ চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। চাঁদাবাজির কারণে কেউ শান্তিতে নেই। আপনারা কি চান আবার চাঁদাবাজি ফিরে আসুক, ফ্যাসিবাদী শক্তি ফিরে আসুক? তাহলে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিকে ভোট দিন।
তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় এলে আমরা চাঁদাবাজি করব না, চাঁদা ভিক্ষার চাইতে নিকৃষ্ট। আমরা মামলাবাজি করব না। আমরা কারো প্রতি জুলুম করব না। ঘোষণা দিয়েছিলাম, কোনো নিরীহ ব্যক্তি যেন আমাদের নিপীড়নের শিকার না হয়।
আমরা লুটপাট আর চাঁদাবাজির রাজনীতি করিনি। ইনশা আল্লাহ আগামীতেও করব না।’ জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজদের অস্তিত্ব রাখব না। তোমরা অভাবে থাকলে আমরা আমাদের রিজিক থেকে ভাগ করে খাব, তবু চাঁদাবাজি কোরো না।’
মা-বোনদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মা-বোনরা কোনো জুজুর ভয় পাবেন না।
কোনো ভয়ভীতিতে আপনারা ক্ষান্ত হবেন না। আপনারা ন্যায়ের পক্ষে ভোট দিন। চাঁদাবাজদের রুখে দিন। জামায়াত ক্ষমতায় এলেই মা-বোনরা নিরাপদে থাকবেন।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা সেই মা, যাঁরা আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ আর ওসমান হাদিদের জন্ম দিয়েছেন। যারা আপনাদের ভয় দেখায়, আপনারা তাদের রুখে দিন; বলুন, ভোট আমি দিতে যাব, পারলে ঠেকাও।’
এর আগে নোয়াখালী জিলা স্কুল মাঠে নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতের আমির বলেন, বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে লড়াই শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, যাঁরা দেশকে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে পেরেছেন, তাঁদের হাতেই দেশ গেলে একটি ভালোবাসার বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। মানুষ তা বুঝতে পেরেছে বলেই সারা দেশে ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে বাঁধভাঙা জোয়ার দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘নোয়াখালীবাসীর সব দাবি যৌক্তিক। আমরা ক্ষমতায় গেলে নোয়াখালী বিভাগ বাস্তবায়ন, নোয়াখালী সিটি করপোরেশন, সুবর্ণচরকে পৌরসভা করাসহ সব দাবি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।’
১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী এই জনসভায় জামায়াতের আমির বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছে, সেই যুবসমাজ ১৩ তারিখ থেকে একটি নতুন বাংলাদেশ দেখার জন্য মুখিয়ে আছে। তারা বুঝে গেছে, জুলাই চেতনার আকাঙ্ক্ষা কারা বাস্তবায়ন করতে পারবে।
তিনি আরো বলেন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে কাউকে দ্বিতীয় আয়ের পথ খুঁজতে বা টেবিলের নিচে হাত দিতে না হয়। এর পরও কেউ দুর্নীতির পথ ছাড়তে না চাইলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নোয়াখালী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ও নোয়াখালী-৪ আসনের প্রার্থী ইসহাক খন্দকারের সভাপতিত্বে এ জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মা’ছুম, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জাগপা সহসভাপতি রাশেদ খান প্রধানসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা।
ফেনীতে বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ ও আন্তর্জাতিক স্টোডিয়াম নির্মাণ করা হবে
এর আগে গতকাল সকালে ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল মাঠে জেলা জামায়াতের আয়োজনে জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, ‘জামায়াত একা নয়, আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। মান-অভিমান ভুলে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ভোটের মাধ্যমে গণরায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামি। ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী না হলে ভবিষ্যতে ভোটের কোনো মূল্য থাকবে না।
ফেনীর উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে ফেনীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ এবং আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জেলায় সরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এ জনসভায় তিনি আবরার ফাহাদসহ জুলাই আন্দোলনে শহীদদের স্মরণ করেন এবং শহীদ ও আহতদের জাতি চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে বলে মন্তব্য করেন।
নির্বাচিত হলে জাতিকে আর বিভক্ত হতে দেব না
লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গতকাল বিকেলে এক জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচিত হলে জাতিকে আর বিভক্ত হতে দেওয়া হবে না। পুরনো দ্বন্দ্বে ফিরে যাওয়া হবে না। তিনি বলেন, যুবকদের হাতে বেকার ভাতা নয়, মর্যাদার কাজ তুলে দেওয়া হবে। ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের মধ্যে ৬২ শতাংশই তরুণ—এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ যে যুবকদের হাতে যাবে, সেই বার্তা।
এ সময় তিনি লক্ষ্মীপুর-১ আসনের শাপলাকলির প্রার্থী মাহবুব আলম, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী রুহুল আমিন ভূঁইয়া, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের প্রার্থী রেজাউল করিম এবং লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের প্রার্থী হাফিজ উল্যাহর হাতে প্রতীক তুলে দেন।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস যাদের আছে, জনগণকে তাদেরই বেছে নিতে হবে
গতকাল সন্ধ্যায় কুমিল্লার লাকসাম স্টেডিয়ামে আয়োজিত জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, যারা এখনো ফ্যাসিবাদের আচরণ করছে, যারা সংস্কার মানে না, চরিত্র পাল্টায়নি—তাদের দিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস যাদের আছে, জনগণকে তাদেরই বেছে নিতে হবে।
এ সময় তিনি জামায়াতের নেতাদের বিরুদ্ধে অতীতে মিথ্যা মামলা ও সাজানো বিচারের অভিযোগ তুলে বলেন, জামায়াত কারো দয়া বা অনুকম্পা চায়নি, মাথা নত করেনি। বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির সমালোচনা করে তিনি বলেন, এক হাতে ফ্যামিলি কার্ড আর অন্য হাতে মায়ের গায়ে হাত—এ ধরনের রাজনীতি বাংলাদেশ আর দেখতে চায় না।
কুমিল্লা ও লাকসামের জনসভায় জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচিত হলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান ইনসাফ নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, রাজনীতি আর উত্তরাধিকারভিত্তিক থাকবে না; যোগ্যতার ভিত্তিতেই নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। একজন রিকশাচালকের সন্তানও যেন যোগ্যতায় প্রধানমন্ত্রী হতে পারে—সেই বাংলাদেশ গড়াই জামায়াতের লক্ষ্য।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



