ছবি: সংগৃহীত
অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে স্বর্ণের দাম। দেশের বাজারে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতি ভরি স্বর্ণ কেনাবেচা হয়েছে দুই লাখ ৮৬ হাজার টাকায়। এ দর ভ্যাট ছাড়া। ৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করলে দাঁড়ায় তিন লাখ টাকা।
দেশের বাজারে স্বর্ণের দর ঠিক করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। এ ব্যবসায়ী সংগঠনের বেঁধে দেওয়া দর মেনে সব জুয়েলারি ব্যবসায়ী অলংকার বিক্রি করেন। সমিতির নেতারা জানান, ইচ্ছেমতো নয়, আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনা করেই দর নির্ধারণ করছেন তারা। এই দর বাড়ানোয় লাভ হচ্ছে না জানিয়ে নেতারা বলেন, দর যত বাড়ছে, ব্যবসা ততই ‘লাটে উঠছে’।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দেশে প্রথমবারের মতো ভরিপ্রতি স্বর্ণের দাম ৫০ হাজার টাকা ছাড়ায়। পাঁচ বছর পর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তা এক লাখ টাকা অতিক্রম করে। এরপর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দাম বেড়ে দাঁড়ায় দেড় লাখ টাকায় এবং একই বছরের মধ্যেই দুই লাখ টাকার সীমা পার হয়। গত আট বছরে বেড়েছে দুই লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
প্রতিবারই আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দরবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে দেশের বাজারে দর বাড়াচ্ছে বাজুস। অভিযোগ রয়েছে, এখানকার ব্যবসায়ীরা বৈধভাবে সরাসরি স্বর্ণ আমদানি করেন না।
গতকাল দর বাড়ানোর কারণ ছিল আগের দিন বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দরবৃদ্ধি। যেখানে প্রতি আউন্স দর বেড়ে রেকর্ড পাঁচ হাজার ৯৬ ডলার ছাড়িয়েছিল। বৃহস্পতিবার তা আরও বেড়ে পাঁচ হাজার ৩১১ ডলার ছাড়ায়।
রাতে এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও অস্বাভাবিক হারে স্বর্ণের দরবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকতে দেখা গেছে। গোল্ড ডট কো ডট ইউকে ওয়েব পোর্টালের চার্ট অনুযায়ী, গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দর পাঁচ হাজার ৫৩৭ ডলার ছাড়িয়েছিল। ফলে বাজুস আজ শুক্রবার আবারও নতুন করে স্বর্ণের দর বেঁধে দেয় কিনা, তা নিয়ে গুঞ্জন আছে।
তবে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট তো বটেই, মধ্যপ্রাচ্য বা প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায়ও স্বর্ণের দর বেশি। গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য ছিল ভরিপ্রতি প্রায় দুই হাজার ১১৪ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দুই লাখ ৫৮ হাজার টাকা। ওই দর হিসাব করে বাজুস দেশের মধ্যে প্রতি ভরি স্বর্ণের দর দুই লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৮ টাকা নির্ধারণ করেছিল।
জুয়েলারি দোকানিরা জানান, স্বর্ণের দাম যত বাড়ছে ব্যবসা তত প্রায় বন্ধের পথে চলে যাচ্ছে। ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটের ভেনাস জুয়েলার্সের অমিত চৌধুরী জানান, গত বছরের তুলনায় বিক্রি চার ভাগের একভাগে নেমেছে। আগে বিয়ের জন্য কেউ পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার কিনলে এখন এক ভরি নিচ্ছেন।
আরও খারাপ অবস্থার কথা জানান ঢাকার নিউ মার্কেটের সানন্দা জুয়েলার্সের সাগর ঘোষ। তিনি বলেন, দোকান খুলে বসে আছি, ক্রেতা নেই। আগে কেউ পাঁচ ভরি স্বর্ণ কিনলে এখন চার আনা, আট আনা দিয়ে অলংকার গড়ার কথা বলছেন। বিয়েবাড়ির গহনা গড়ার কোনো ‘অর্ডার’ নেই। গত কয়েক বছর ধরে স্বর্ণের দাম যত বাড়ছে, ব্যবসা কমছে তার থেকেও বেশি হারে।
ব্যবসার যখন ক্ষতি হচ্ছে তখন এই দাম বাড়ানো কেন এবং বাংলাদেশে বৈধ প্রক্রিয়ায় স্বর্ণ আমদানি নেই বললেই চলে– এমন প্রশ্নে জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি এনামুল হক খান বলেন, দেশের বাজারে স্বর্ণের দর নির্ধারণের একটা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ অনুসরণ না করলে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হবে। এ কারণে জুয়েলার্স ব্যবসায়ীরা একমত হয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুসরণ করে দেশে দাম নির্ধারণ করা হবে।
প্রতিদিন কেন দর বাড়াতে হচ্ছে– জানতে চাইলে তিনি বলেন, দাম না বাড়ালে দেশের স্বর্ণ পাচার হয়ে যাওয়ার ভয় আছে।
তাঁকে প্রশ্ন করা হয়– আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে ভরি প্রতি দর বেশি। উত্তরে বাজুস সভাপতি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যে দর দেখছেন, তা ‘সলিড গোল্ড’। দেশে জুয়েলারি দোকানে প্রস্তুত করা অলংকার বিক্রি হয়। অলংকার গড়া বাবদ ১২ শতাংশ মজুরি যোগ করে বাজুস দর নির্ধারণ করছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমাগত দরবৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যায় বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডলারের প্রতি আস্থা দুর্বল হওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে।
এদিকে গত বছর তিন দফায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ নীতি সুদহার কমিয়েছিল। ট্রাম্প সরকার চাপ দিচ্ছে আরও কমানোর। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের সঙ্গে দ্বন্দ্বও হচ্ছে। স্বাধীন এ সংস্থার ওপর চটেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এতে দেশটির ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ থেকে মুনাফা কমার শঙ্কায় অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণ কিনছেন। এতেই দর বাড়ছে স্বর্ণের।
এদিকে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি জুয়েলারি সমিতি রুপার দামও বাড়িয়েছে। ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৮১৬ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৫৭৩ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৭৫৮ টাকা বাড়িয়ে আট হাজার ১৬৫ টাকা, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৬৪১ টাকা বাড়িয়ে ছয় হাজার ৯৯৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির এক ভরি রুপার দাম ৪৬৭ টাকা বাড়িয়ে পাঁচ হাজার ২৪৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



