ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্কে সফররত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিনিধিদলকে ঘিরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–এর সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ, অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং তাঁর সহকর্মী সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্ক সময় রাত ১টার দিকে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর বিমানবন্দরের ৮ নম্বর টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। তখন উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ এনসিপি ও জামায়াত নেতারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই সময় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা এনসিপি নেতাদের লক্ষ্য করে স্লোগান দেন এবং আখতার হোসেনের দিকে ডিম ছোড়েন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে জামায়াত ও বিএনপির কয়েকজন নেতা তাঁদের সুরক্ষায় এগিয়ে আসেন। অন্যদিকে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে তাঁর কর্মীরা নিরাপত্তা দিয়ে গাড়িতে তুলে নেন।
এ ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমানকে পরে স্থানীয় পুলিশ গ্রেপ্তার করে। সোমবার গভীর রাতে জ্যাকসন হাইটস এলাকার নবান্ন রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে তাঁকে আটক করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাঁকে একদিন হাজতে রাখা হবে।
ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আখতার হোসেন বলেন, “আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা এর আগেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড করেছে। দেশে-বিদেশে আমাদের দমন করতে চায়, কিন্তু আমরা ভয় পাই না। বাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসের জবাব দেবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “মানুষ অতীতে জীবন উৎসর্গ করেছে, ভবিষ্যতেও প্রতিরোধে পিছপা হবে না।”
এনসিপির আমেরিকায় বসবাসরত নেতাকর্মীরা হোটেলে পৌঁছে আওয়ামী কর্মীদের স্লোগানের জবাবে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগান দেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “ঘটনা প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ তাদের অন্যায়ের জন্য কোনো অনুশোচনা করছে না। আইনগতভাবে এদের বিচার হবে।”
জামায়াত নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “এটি হতাশ হওয়ার মতো কিছু নয়, তবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য লজ্জাজনক। যাঁরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাঁরা নিজেরাই অসম্মানিত হয়েছেন।” তিনি হাইকমিশনের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কথাও উল্লেখ করেন।
এ ঘটনায় রাজনৈতিক মহল ছাড়াও নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠন থেকেও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।
-
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আজও জনগণের ক্ষোভ বুঝতে পারছে না। নিউইয়র্কে তাদের এই অশ্লীলতা শুধু হতাশার বহিঃপ্রকাশ।”
-
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এক বিবৃতিতে বলেছে, “আখতার হোসেন ও ডা. তাসনিম জারার ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আওয়ামী লীগ।”
-
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অভিযোগ করেছে, “প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিউইয়র্কের ঘটনায় ভবিষ্যতের নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
ডা. তাসনিম জারা তাঁর ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “এটি আমার ব্যক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর হামলা। আমি যে দলকে প্রতিনিধিত্ব করি, সেটি ফ্যাসিবাদের কাঠামো ভাঙার জন্য সংগ্রাম করছে।”
এনসিপির বিভিন্ন আঞ্চলিক নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, “আওয়ামী লীগের কর্মীরা জানোয়ারের মতো আচরণ করছে।” দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, “বিদেশে কিছু উচ্ছিষ্টও আখতারকে দমন করতে পারবে না।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীমউদ্দীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক শেখ তানভীর বারী হামিম ফেসবুকে লেখেন, “যেখানে আওয়ামী লীগ, সেখানেই প্রতিরোধ।”
এনসিপি মঙ্গলবার বিকেলে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এর আগে দুপুরে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “প্রশাসনের লোকজনের ভেতর থেকে তথ্য পাচার করা হচ্ছে। এ হামলার দায় সরকারেরই।” তিনি আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে ট্রাইব্যুনালে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান এবং নিউইয়র্ক কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেলের পদত্যাগ দাবি করেন।
মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী এ ঘটনাকে “ন্যক্কারজনক” আখ্যা দিয়ে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গীদের ওপর হামলা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এটি গুরুত্ব সহকারে নেবে।”
পুরো ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সরকারি দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের এ ধরনের আক্রমণ শুধু ভিন্নমতের রাজনীতিকদের ওপর আক্রমণ নয়, বরং দেশের ভাবমূর্তি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



