ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এই উত্তরণ যাতে মসৃণ ও টেকসই হয়, সেই লক্ষ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-র কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৮০তম সাধারণ পরিষদের ফাঁকে মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ডব্লিউটিও মহাপরিচালক ড. এনগোজি ওকোনজো-ইওয়ালার সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই অনুরোধ জানান।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় বাংলাদেশ যে বিশেষ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে রপ্তানি সুবিধার অবসান, বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা, এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা—এসব বিষয়ে ডব্লিউটিওর সহায়তা অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ আমাদের জন্য সম্মানের হলেও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও বটে। এই পরিবর্তন যাতে আমাদের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জন্য কোনো ধাক্কা না আনে, সে জন্য ডব্লিউটিওর সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।”
ডব্লিউটিও মহাপরিচালক ড. এনগোজি ওকোনজো-ইওয়ালা বৈঠকে বাংলাদেশের অনুরোধের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেন। তিনি বলেন, “বিশ্ব বাণিজ্য নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও স্থিতিশীল রয়েছে। আজও বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ ডব্লিউটিওর নিয়ম দ্বারা পরিচালিত হয়। এই নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত।”
তিনি আরও বলেন, ডব্লিউটিওর ভেতরে সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এবং এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। “ডব্লিউটিওকে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে। আমার আপনার নেতৃত্ব চাই। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া বৈশ্বিক বাণিজ্যের ন্যায়সংগত উন্নতি সম্ভব নয়।”
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বৈঠকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কারের প্রতি জোর দিয়ে বলেন, দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ডব্লিউটিওকে নতুনভাবে মানিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, “চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সময় এসেছে। কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নয়, অর্থবহ পরিবর্তনের জন্য আমাদের এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের পক্ষে তার শক্তিশালী কণ্ঠস্বর তুলতে প্রস্তুত।”
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ করবে। দীর্ঘদিনের অগ্রগতি, প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় উন্নতি—এসব সূচক পূরণ করার পর এ স্বীকৃতি আসছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, রপ্তানিতে বিশেষ সুবিধা (ডিউটি-ফ্রি ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার) হারানো বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হতে পারে। এর পাশাপাশি ঋণের বোঝা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং জ্বালানি সংকট দেশের সামনে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপট
ডব্লিউটিও মহাপরিচালক বৈঠকে বলেন, “বহু শঙ্কা সত্ত্বেও বিশ্ব বাণিজ্য এখনো স্থিতিশীল। এটি আমাদের জন্য আশার বিষয়। তবে প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা, নীতি সংস্কারের বিলম্ব এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবেলায় সকল দেশের সক্রিয় সহযোগিতা অপরিহার্য।”
তিনি বাংলাদেশের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা ভবিষ্যতে ডব্লিউটিও সংস্কারের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক হতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জ্বালানি ও পরিবহন উপদেষ্টা ফওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফী সিদ্দিকী এবং এসডিজি সমন্বয়ক ও সিনিয়র সচিব লামিয়া মোর্শেদ। তারা ডব্লিউটিও মহাপরিচালকের কাছে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিশেষ সুবিধার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাণিজ্যে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পূর্ণ সহযোগিতা, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং বাংলাদেশ সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডব্লিউটিওর সক্রিয় সহায়তা না পেলে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে কঠিন লড়াই করতে হবে। আর এজন্য এখনই আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা অপরিহার্য।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



