ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে অপহরণের মতো ভয়াবহ অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এ অপরাধের হার দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা এটিকে একটি গুরুতর সামাজিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে—রাষ্ট্রীয় আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়েছে, অপরাধ দমন সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, এবং সমাজের ভেতরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েন ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশিত মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসে অপহরণের শিকার হয়েছেন ৭১৫ জন মানুষ। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩৪০ জন। অর্থাৎ, এ বছর গড়ে প্রতিদিন তিনজনেরও বেশি মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছেন। এ পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যাগত নয়, বরং সামগ্রিকভাবে আইন-শৃঙ্খলার বড় ধরনের অবনতির প্রমাণ বহন করছে।
চলতি বছরের জুলাই মাস অপহরণের ইতিহাসে এক ভয়াবহ রেকর্ড তৈরি করেছে। ওই মাসে একাই ১০৯ জন মানুষ অপহৃত হয়েছেন, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একইভাবে জানুয়ারিতে ১০৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৭৮ জন, মার্চে ৮৩ জন, এপ্রিলে ৮৮ জন, মেতে ৮২ জন, জুনে ৮০ জন এবং আগস্টে ৯০ জন মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছেন।
২০২৪ সালে সারাবছরে মোট ৬৪২ জন মানুষ অপহৃত হয়েছিলেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৫১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪৩ জন, মার্চে ৫১ জন, এপ্রিলে ৫৫ জন, মে মাসে ৫০ জন, জুনে ৩১ জন, জুলাইয়ে ৩২ জন এবং আগস্টে ২৭ জন। তখন আট মাসে অপহৃত হয়েছিল ৩৪০ জন, যা মাসে গড়ে ৪২.৫ জন। আর এ বছর একই সময়ে এই গড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯.৩৮ জনে—গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) সম্প্রতি প্রকাশ করেছে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন—‘বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টস ২০২০-২৫: এ ডেটা-ড্রাইভেন লুক অ্যাট রাইজিং ক্রাইম ট্রেন্ডস’। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মাসে গড়ে ৮৬.১৭টি অপহরণের ঘটনা ঘটছে, যা আগের বছর ছিল ৫৩.৫। এ হিসাবে অপহরণ বেড়েছে ৬১.০৭ শতাংশ, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী প্রতি মাসেই অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে, যাতে নাগরিকরা সমসাময়িক অপরাধ প্রবণতা সম্পর্কে জানতে পারেন। কখনো কোনো অপরাধ বৃদ্ধি পায়, আবার কোনোটি কমে। যেসব অপরাধ বাড়ে, সে বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করি।”
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের এ ধরনের ব্যাখ্যা জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারম্যান জেড আই খান পান্না বলেন, “মামলার যে সংখ্যা প্রকাশিত হয়, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে মামলা পর্যন্ত হয় না। দেশে এখন কার্যত আইনের শাসন নেই, আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। ফলে অপরাধীরা নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছে, অপরাধও বেড়ে চলেছে।”
অপরাধবিষয়ক গবেষক ও বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “যখন কোনো অপরাধ বাড়ে, তখন পুলিশ বা প্রশাসন সেটির বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আসল কাজ হওয়া উচিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, ফলে তারা প্রকৃত অপরাধ দমনে মনোযোগ দেয় না। এর ফলে অপরাধীরা সুযোগ পায়, সমাজে অপরাধ প্রবণতা বাড়ে। গড়ে প্রতিদিন তিনজন অপহৃত হওয়া প্রমাণ করছে, দেশে আইনের শাসনের ভয়াবহ ঘাটতি রয়েছে।”
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপহরণের পেছনে অন্যতম বড় কারণ অর্থনৈতিক সংকট। চাঁদাবাজি, মুক্তিপণ আদায়, ব্যবসায়িক বা পারিবারিক শত্রুতা ছাড়াও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থেকে অপরাধীরা সহজ অর্থের জন্য অপহরণে জড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে এক বছরে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ২০ হাজার। অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থানের অভাব ও আয়হীনতার কারণে অনেকেই প্রথমে ঋণগ্রস্ত হয়, পরে অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক চাপ ও হতাশা সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক তিনটি অপহরণ ঘটনা
১. চট্টগ্রামের পটিয়া (১৭ সেপ্টেম্বর): মুরগি ব্যবসায়ী নুরুল আবছারকে সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে। তার কাছ থেকে সঙ্গে থাকা ৪০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করে ১৭ লাখ টাকা। তবে পুলিশের দ্রুত তৎপরতায় দুই ঘণ্টার মধ্যেই তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
২. কুমিল্লা (১৭ সেপ্টেম্বর): রিকশাচালক মেহেদী হাসানকে অপহরণের ৩৬ দিন পর তাঁর মাথার খুলি উদ্ধার করে সিআইডি। অটোরিকশা ছিনতাইয়ের জন্য তাকে হত্যা করা হয়েছিল বলে অপহরণকারীরা স্বীকার করেছে। এই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
৩. চাঁপাইনবাবগঞ্জ (১৫ সেপ্টেম্বর): পাওনা টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে মো. সানি আহম্মেদকে অপহরণ করা হয়। পরিবার থেকে ৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পুলিশ পরে তাকে উদ্ধার করে এবং পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।
বাংলাদেশে অপহরণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা শুধু অপরাধ পরিসংখ্যানের একটি অংশ নয়, বরং এটি সমাজের গভীর সংকটের প্রতিফলন। রাজনৈতিক প্রভাব, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ ও বেকারত্ব—সব মিলিয়ে অপহরণের মতো অপরাধ ভয়াবহভাবে বেড়ে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিলেও কার্যকর প্রতিরোধ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপহরণ ঠেকাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



