ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন কর্মজীবী মানুষ। ৯ দিনের ছুটি ঘোষণার পরপরই রাজধানী ছাড়ার হিড়িক পড়েছে। তবে দুর্ভোগ এড়াতে রাত-দিন সড়কে ছুটছেন হাজারো যাত্রী। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানজট, রাস্তার উন্নয়ন কাজ এবং অবৈধ বাজার ও দোকানের কারণে স্বাভাবিক যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, যাত্রী ও যানবাহনের চাপ আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
মহাসড়কে দুর্ভোগের চিত্র
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ঢাকা-উত্তরবঙ্গ ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যান চলাচল ধীরগতিতে হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, কাঁচপুরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘ যানজট দেখা যাচ্ছে। এসব এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলায় রাস্তা সরু হয়ে গেছে, ফলে গাড়িগুলো ধীরগতিতে চলছে।
বিশেষত, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশের প্রায় ২২ কিলোমিটার জুড়ে ছয়টি এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ২১ কিলোমিটারের মধ্যে সাতটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে যানজটপ্রবণ এলাকা হিসেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেঘনা টোল প্লাজা দিয়ে প্রতিদিন ১৮ থেকে ২২ হাজার যানবাহন চলাচল করে, যা ঈদের সময় বেড়ে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ফলে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।
সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ
যাত্রীদের অভিযোগ, যানজটের কারণে কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে দ্বিগুণ বা তারও বেশি। গাজীপুরগামী যাত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, "সাধারণত দুই ঘণ্টার পথ পাঁচ ঘণ্টায়ও শেষ হচ্ছে না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি।"
এদিকে পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, অতিরিক্ত গাড়ি, যাত্রী উঠানামার সময় রাস্তা বন্ধ রাখা এবং ছোট যানবাহনের কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে। হানিফ পরিবহনের সুপারভাইজার সানাউল্লাহ বলেন, "বাসস্ট্যান্ডে যাত্রী ওঠা-নামার জন্য গাড়ি কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হয়, এতে রাস্তায় যানজট আরও বাড়ে।"
নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইল মহাসড়কে বিশেষ নজরদারি
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি কাজী ওয়াহিদ মোরশেদ জানান, "আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছি। হাইওয়েতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে এবং টহল টিমের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।"
এদিকে, ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে যানজট রোধে প্রশাসন চারটি সেক্টরে ভাগ করে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবীর পাভেল বলেন, "যানবাহনের চাপ বাড়ার কারণে প্রতিদিন ১৮-২০ হাজারের পরিবর্তে ৫০ হাজার যানবাহন পারাপার হতে পারে। এজন্য ১৮টি বুথের মাধ্যমে টোল আদায় করা হবে এবং যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।"
১২টি হটস্পটে বিশেষ ব্যবস্থা ও রোভার স্কাউটের নিয়োজিত বাহিনী
কুমিল্লার হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য ও ২০০ জন রোভার স্কাউট মোতায়েন থাকবে। কুমিল্লা রোভার স্কাউটের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন লিটন বলেন, "আমাদের সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে পুলিশকে সহযোগিতা করতে পারে।"
আজ থেকে ট্রেনে ঈদযাত্রা শুরু, থাকছে বিশেষ ট্রেন
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, "আজ থেকে ট্রেনে ঈদযাত্রা শুরু হচ্ছে। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণে ১০টি ঈদ স্পেশাল ট্রেন চালানো হচ্ছে। এছাড়া, ৪৪টি নতুন কোচ যুক্ত করা হয়েছে।"
এ বছর আসনবিহীন টিকিট বিক্রির নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। আন্তঃনগর ট্রেনের শোভন সিট ও শোভন চেয়ার ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণিতে দাঁড়িয়ে ভ্রমণের সুযোগ নেই। এছাড়া, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ রুটে বিশেষ ট্রেন চলবে।
যানজট রোধে সরকারি পদক্ষেপ ও জনসচেতনতা জরুরি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদযাত্রার প্রধান সমস্যা হল অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের চাপ, রাস্তার উন্নয়ন কাজ এবং ছোট যানবাহনের বিশৃঙ্খল চলাচল। এ অবস্থায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং বাসস্ট্যান্ডে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, "যানজট নিয়ন্ত্রণে আমরা সার্বক্ষণিক মাঠে থাকছি। যাত্রীরা সচেতন হলে এবং যত্রতত্র গাড়ি থামানো বন্ধ করলে সমস্যা অনেকটাই কমবে।"
এদিকে, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, "ঈদের আনন্দ যেন রাস্তার ভোগান্তিতে ম্লান না হয়। সময়মতো বাড়ি ফিরতে পারলেই আমাদের ঈদ পরিপূর্ণ হবে।"
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



