ছবি: সংগৃহীত
একটি মাত্র অসাবধানী ক্লিক, অচেনা নম্বরে যাওয়া ওটিপি (OTP) কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠানো কোনো লোভনীয় বার্তা—তাতেই নিমিষে খালি হয়ে যাচ্ছে সারা জীবনের সঞ্চয়। হারিয়ে যাচ্ছে মানসিক শান্তি, বিঘ্নিত হচ্ছে পরিবার ও সমাজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। দেশে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসারের পাশাপাশি সমান্তরালভাবে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধের বিস্তার। ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ঢাল বানিয়ে একশ্রেণির অপরাধী নিত্যনতুন কৌশলে মানুষকে ফাঁদে ফেলছে।
এই অদৃশ্য ও জটিল হুমকি মোকাবিলায় পুলিশের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, দ্রুত তদন্তের জন্য বিশেষায়িত ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব গঠন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সরকার এক বিস্তৃত সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
অপরাধের ছদ্মবেশ: ঘরে বসে আয়ের প্রলোভন ও ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল
সাইবার অপরাধীরা এখন আর পুরোনো কৌশলে সীমাবদ্ধ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন নিত্যনতুন উপায়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে:
আর্থিক প্রতারণার ফাঁদ: সাধারণ গৃহিণী, বেকার যুবক ও শিক্ষার্থীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামে ‘ঘরে বসে খণ্ডকালীন কাজ’, ইউটিউব ভিডিওতে ‘লাইক’ দিয়ে টাকা আয় কিংবা সামান্য বিনিয়োগে দ্বিগুণ লাভের বার্তা পাঠানো হয়। শুরুতে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে ১-২ হাজার টাকা বোনাস দিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে 'টাস্ক' বা ধাপ পূরণের কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে রাতারাতি ভুয়া অ্যাকাউন্টের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
চরিত্রহনন ও মানসিক নিপীড়ন: ভুয়া ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম আইডি খুলে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও বিকৃত (ডিপফেক) করে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা তীব্র মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও সামাজিক লজ্জার মুখোমুখি হচ্ছেন।
ডিজিটাল তথ্য চুরি: ওটিপি শেয়ারিং, ক্ষতিকারক অ্যাপস ও লিংকের মাধ্যমে স্পর্শকাতর পাসওয়ার্ড চুরি করে মোবাইল ও অনলাইন ব্যাংকিং থেকে সব টাকা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন,
"আমাদের দেশে সাইবার অপরাধের বৃদ্ধিটা এখন আর সাধারণ হারে নেই, এটি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ডিপফেক প্রযুক্তি, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন জুয়ার মতো জটিল মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্নমধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষ। অনেকে সহায়-সম্বল হারিয়ে মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন যে, মৃত্যুর দিকেও ধাবিত হচ্ছেন।"
সাইবার অপরাধের রাশ টানতে সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ
সাইবার অপরাধের বৈশ্বিক ও দেশীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার এবং বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে সমন্বিত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:
১. স্বতন্ত্র 'সাইবার পুলিশ ইউনিট' গঠন
ডিজিটাল অপরাধের ওপর বিশেষভাবে নজরদারি ও দ্রুত ব্যবস্থার লক্ষ্যে চলতি বছরের ১ অক্টোবর একটি স্বতন্ত্র 'সাইবার পুলিশ ইউনিট' আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। ৪,৫৯২ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়ে গঠিত এই বিশেষায়িত ইউনিটটি কেন্দ্রীয়ভাবে একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা এমনকি থানা পর্যায় পর্যন্ত এই ইউনিটের আওতায় বিশেষ সাইবার ডেস্ক গঠন করা হয়েছে।
২. ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাবের বি
দ্রুত ও নিখুঁত করতে ল্যাবরেটরির সংখ্যা ও আধুনিকায়ন বাড়ানো হচ্ছে:
ঢাকায় ডিএমপির গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) একটি আধুনিক সাইবার ল্যাব চালুর পাশাপাশি সম্প্রতি কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমে (সিটিটিসি) আরও একটি আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এতদিন এসব সুবিধা প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক থাকলেও আঞ্চলিক সক্ষমতা বাড়াতে ঢাকার বাইরে সম্প্রতি চট্টগ্রামেও ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে।
৩. প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি: 'ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স'
আধুনিক অপরাধের ডিজিটাল আলামত উদ্ধার ও বিশ্লেষণের জন্য তদন্তকারীদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
মিরপুরের পুলিশ স্টাফ কলেজে সম্প্রতি সাইবার অপরাধ তদন্তের ওপর ১০ দিনব্যাপী ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (ToT) কোর্সের আয়োজন করা হয়, যেখান থেকে ৩৩২ জন উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন। এই মাস্টার ট্রেইনাররা এখন মাঠপর্যায়ের অন্যান্য তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) নিজস্ব 'সাইবার ট্রেনিং সেন্টার', 'ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এফটিআই)' এবং 'ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস)' নিত্যনতুন অপরাধ মডিউল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান ও বর্তমান অভিযানের চিত্র
ডিজিটাল অপরাধীদের সনাক্তকরণ ও তাদের আইনের আওতায় আনতে ডিএমপি ও সিআইডির বিভিন্ন ইউনিট নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান এক নজরে:
সিআইডি (১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ – ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬): সাইবার প্রতারণা সংক্রান্ত জিআর ৩২টি এবং সিআর ১৫৯টিসহ মোট ১৯১টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে এবং ১০১ জন মূল অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিএমপির বিভিন্ন বিভাগ (চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আপডেট সময় পর্যন্ত):
রমনা বিভাগ: ৮৮টি মামলা, গ্রেপ্তার ১৬৩ জন।
তেজগাঁও বিভাগ: ৫৩টি মামলা, গ্রেপ্তার ৪৯ জন।
গুলশান বিভাগ: ৩৮টি মামলা, গ্রেপ্তার ৩৭ জন।
মিরপুর ও মতিঝিল বিভাগ: যথাক্রমে ৩৩টি করে মোট ৬৬টি মামলা এবং ৭৬ জন গ্রেপ্তার।
লালবাগ, ওয়ারী ও উত্তরা বিভাগ: মোট ৬০টি মামলা এবং ৮১ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, যেকোনো অনলাইন জালিয়াতি, হ্যাকিং বা হয়রানির অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে পেশাদারিত্বের সাথে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত অনলাইন নজরদারি বজায় রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ডিএমপির গোয়েন্দা প্রধান (অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার) মো. শফিকুল ইসলাম ও মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও ভার্চুয়াল জগতের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে যেকোনো সাইবার অপরাধীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পুলিশ সর্বদা তৎপর রয়েছে।
সচেতনতাই সেরা প্রতিরোধ: বিশেষজ্ঞদের সুরক্ষা পরামর্শ
সাইবার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তিগত কাঠামোর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা। অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়াতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন:
লোভনীয় মেসেজ এড়িয়ে চলা: ঘরে বসে কম পরিশ্রমে আয় বা প্রলোভনমূলক কোনো অফারের লিংকে ক্লিক না করা।
ওটিপি ও পাসওয়ার্ডের সুরক্ষার গুরুত্ব: ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার পিন (PIN), ওটিপি (OTP) কখনোই বন্ধু বা অপরিচিত ব্যক্তির সাথে শেয়ার না করা।
কঠিন পাসওয়ার্ড ও ২FA ব্যবহার: অ্যাকাউন্টের সুরক্ষায় শক্তিশালী পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (2FA) চালু রাখা।
ব্যক্তিগত তথ্যের সীমা নির্ধারণ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত ছবি, অবস্থান বা পারিবারিক সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ না করা।
ডিজিটাল যুগের সুযোগ-সুবিধাকে নিরাপদ রাখতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে, তার পাশাপাশি জনগণের নিজস্ব সচেতনতাই পারে সাইবার অপরাধের এই নীল ছোবল থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



