ছবি: সংগৃহীত
ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্সে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, পুরো ইউরোপ জুড়ে তৈরি পোশাকের সার্বিক চাহিদা হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা-ব্র্যান্ডগুলোর নজিরবিহীন দরকষাকষির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। একই সঙ্গে তিনটি পৃথক বড় প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ায় দেশের প্রধান এ রপ্তানি খাতটিতে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রপ্তানি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে বিভিন্ন বাজারে মিশ্র চিত্র ফুটে উঠলেও সার্বিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশি পোশাকের গড় মূল্য বা ইউনিট প্রাইস মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এর সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়ছে রপ্তানিকারকদের মুনাফা, কারখানার নিত্যদিনের উৎপাদন এবং সাধারণ পোশাক শ্রমিকদের ওভারটাইম বা অতিরিক্ত আয়ের ওপর।
গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার সুইং অপারেটর রহিমা খাতুনের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতায় শিল্পটির বর্তমান কষ্টের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রহিমা খাতুন জানান, আগে কারখানায় নিয়মিত রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কাজ বা ওভারটাইম করে বাড়তি অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকত, যা দিয়ে সংসারের অতিরিক্ত খরচ মেটানো যেত। কিন্তু বর্তমানে কাজের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক দিনই বিকেল ৫টার মধ্যে কারখানা ছুটি হয়ে যাচ্ছে। ইউরো অঞ্চলে ক্রেতাদের অর্ডার কমে যাওয়ায় কারখানার মালিকপক্ষ ওভারটাইম কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। মূল্যস্ফীতির এই সময়ে মূল বেতনের সঙ্গে ওভারটাইমের টাকা না পাওয়ায় দৈনন্দিন বাজারসদাই পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং একই সাথে চাকরি হারানোর এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও মানসিক ভয় তাড়া করে বেড়াচ্ছে হাজারো শ্রমিককে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সামগ্রিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ৩.৩৩ শতাংশের একটি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে একক দেশ হিসেবে ফরাসি বাজারে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। উল্লিখিত তিন মাসে ফ্রান্সে পোশাক রপ্তানি ৪.৯১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। বিপরীতে স্পেনের বাজারে প্রবৃদ্ধি এসেছে ১৩.৭৩ শতাংশ, যার অর্থের পরিমাণ ১১৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার।
তবে ইউরোস্ট্যাটের সংগৃহীত সামগ্রিক বার্ষিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্র। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোস্ট্যাটের তথ্যানুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের সার্বিক পোশাক রপ্তানি আয় ১১.৬৭ শতাংশ হারে বিশাল ধাক্কা খেয়ে ১,১৯৩ কোটি ইউরোর কাছাকাছি নেমে এসেছে। কেবল আয়ের অঙ্কই কমেনি, ইউরো অঞ্চলে পোশাক চালানের সার্বিক পরিমাণ বা ভলিউম কমেছে ৪.৫৮ শতাংশ। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য কেজিপ্রতি ১৪.৮৭ ইউরো থেকে একলাফে কমে ১৩.৭৬ ইউরোতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা আগের সমপরিমাণ বা বেশি পোশাক বাজারে সরবরাহ করেও তুলনামূলক কম আয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ইইউর মোট পোশাক আমদানির বাজারে বাংলাদেশের একক অংশীদারিত্ব বা শেয়ার ২১.৫ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১৯.৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
ইউরোপীয় ভোক্তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পোশাকের মতো অনাবশ্যক কেনাকাটায় তারা রাশ টেনেছেন। খুচরা বিক্রি কমে যাওয়ায় বিদেশি ব্র্যান্ড ও ফ্যাশন শপগুলোর গুদামে অবিক্রীত পোশাকের পাহাড় জমেছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন অর্ডার দেওয়া কমিয়ে দেওয়া, প্রস্তুত করা চালানের ডেলিভারি আটকে দেওয়া এবং জোরপূর্বক মূল্যছাড় (ডিসকাউন্ট) দাবি করার নজির দেখা যাচ্ছে।
কারখানা মালিকদের জন্য এই ধাক্কা সামলানো রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং। তৈরি পোশাকের কাস্টমাইজড অর্ডারের জন্য আগেই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে সুতা, কাপড়ের মতো কাঁচামাল সংগ্রহ এবং শ্রমিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ক্রয়াদেশ স্থগিত হলে বা সময়মতো চালান না নিলে উদ্যোক্তাদের শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে যায়। উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকলেও বিপরীতে পণ্যের ইউনিট প্রাইস কমে যাওয়ায় শিল্পমালিকদের মুনাফার হার মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে।
পরিস্থিতি মূল্যায়নে তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, সামগ্রিক আন্তর্জাতিক প্রবৃদ্ধি এমনিতেই মন্থর ছিল, তার ওপর ফরাসি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাত নতুন মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ভূত ঝুঁকি এড়াতে সব সদস্য কারখানাকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে নতুন নতুন অসংপ্রথাগত বাজার অনুসন্ধান এবং বিশ্ববাজারের উপযোগিতা বজায় রেখে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের ওপর জোরালো জোর দেওয়া হচ্ছে।
ফ্রান্সে চলমান ধর্মঘট, সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা ও যোগাযোগ অবকাঠামো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফরাসি ক্রেতাদের কেনাকাটার আস্থা কমে যাওয়ায় নতুন পণ্যের ফরমাশে ভাটা পড়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পুরো ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধাক্কার পেছনে কেবল ফ্রান্সের সামাজিক অবস্থাই একমাত্র কারণ নয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বিষয়টির বিশ্লেষণ করে বলেন, ইইউ অঞ্চলে বাংলাদেশি পোশাকের সার্বিক চাহিদা নির্ভর করে পুরো ইউরো অঞ্চলের মোট ব্যবহার, জীবনযাত্রার মান এবং প্রধান প্রধান ব্র্যান্ডের কাছে থাকা মজুদের ওপর। তাই ফ্রান্সে অনাকাঙ্ক্ষিত দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অস্থিরতা কোনো একক বড় হুমকি হলেও, পুরো ইউরোপের গতিপথ শুধুই ফ্রান্সের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইউরো অঞ্চলজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণে ইউরোপীয় পরিবারগুলো পোশাক কেনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখছে বা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মতো কারখানাগুলোকে তীব্র দরকষাকষির মুখে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে।
কারখানায় নতুন ক্রয়াদেশ হ্রাস পাওয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন কর্মঘণ্টায়। ওভারটাইম কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের মাস শেষে অর্জিত নিট আয় নাটকীয়ভাবে কমে গেছে, যা তাদের জীবনযাত্রার মানকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই চাপ দীর্ঘায়িত হলে দেশের কারখানাগুলোতে সাময়িকভাবে নতুন নিয়োগ বন্ধ রাখা বা উৎপাদন সক্ষমতা কাটছাঁট করার মতো কঠিন সিদ্ধান্তের শঙ্কা তৈরি হবে।
এই সংকট উত্তরণে স্বল্পমেয়াদে রপ্তানিকারক ও উদ্যোক্তাদের নিয়মিতভাবে ক্রেতাদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করা, সম্ভাব্য অর্ডারের ঝুঁকি আগে থেকে অনুমান করা এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় ফ্লেক্সিবিলিটি বা নমনীয়তা আনয়ন করা প্রয়োজন। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ হিসেবে শুধুমাত্র ট্র্যাডিশনাল পোশাকের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের (হাই-ভ্যালু) ফ্যাশন সামগ্রী তৈরি, কারখানায় অটোমেশন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম তন্তুর (ম্যান-মেড ফাইবার) পোশাকে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ফ্রান্সের ভেতরের সামাজিক পরিবেশ শান্ত হলে সাময়িক ধাক্কা হয়তো কাটবে, কিন্তু ইউরোপের মূল অর্থনীতির চাপ মোকাবেলা করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও বহুমুখী সক্ষমতা বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



