ছবি: সংগৃহীত
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে চলেছে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন বেতন কাঠামো বা পে–স্কেল কার্যকর করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে চলতি সরকারের মেয়াদকালেই। এ ক্ষেত্রে আগামী রাজনৈতিক সরকারের জন্য অপেক্ষা না করে বর্তমান অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটেই প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখা হবে। ফলে ২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশজুড়ে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর অর্থ মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ তথ্য জানান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, এই সরকারের মেয়াদেই নতুন পে–স্কেল কার্যকর হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে, তার রূপরেখা শিগগিরই দেখা যাবে। উপদেষ্টা আরও বলেন, আগামী বছরের মার্চ বা এপ্রিল নাগাদ নতুন পে–স্কেল চালু করতে চাইলে চলতি বাজেটেই অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। সে জন্য বাজেট সংশোধনের সময় ডিসেম্বর মাস থেকে প্রয়োজনীয় ধারা সংযোজন করা হবে।
সরকার গত ২৪ জুলাই নতুন পে কমিশন গঠন করে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। কমিশন ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ জমা দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। কমিশনের এক সদস্য জানিয়েছেন, এখনো সর্বোচ্চ (গ্রেড–১) ও সর্বনিম্ন (গ্রেড–২০) পদের বেতন কাঠামোর গ্রেড সংখ্যা নির্ধারণ চূড়ান্ত হয়নি। তবে অনুপাতের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০:১ সীমারেখার মধ্যে থেকেই সুপারিশ আসবে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় এ অনুপাত ৮:১ থেকে ১০:১–এর মধ্যে রাখা হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে একই ধরনের অনুপাত প্রচলিত রয়েছে।
এছাড়া পে কমিশন ভাতাসমূহে সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা ও অবসর-পরবর্তী সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে কমিশন প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে। বর্তমানে একজন সরকারি কর্মকর্তা চাকরির শুরু থেকে অবসর পর্যন্ত মাসে ১,৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। এই অঙ্ক বাড়ানোর সুপারিশ করা হবে, যাতে অবসর-পরবর্তী সময়েও বাড়তি সুবিধা ভোগ করা যায়। একইভাবে সন্তানদের জন্য শিক্ষা ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাবও কমিশনের সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
২০১৫ সালে ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করে ১০ বছর পর স্বয়ংক্রিয় পদোন্নতির ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। এবারও কমিশন সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পদোন্নতির প্রক্রিয়া আরও সহজ করার সুপারিশ করতে পারে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মজীবনকে আরও আকর্ষণীয় ও সুষ্ঠু করার সুযোগ তৈরি হবে।
জাতীয় বেতন কাঠামোর বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিদ্যুৎ কোম্পানি, সশস্ত্র বাহিনী ও বিচারকদের জন্য বিশেষ কাঠামো বিদ্যমান। এসব খাতে বেতন-ভাতা ভিন্ন হলেও মূল কাঠামোর সঙ্গে মিল রাখা হয়েছে। পে কমিশন বলেছে, এই খাতগুলোকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জাতীয় কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সুপারিশ করা হবে।
কমিশন মনে করছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে বেসরকারি খাতেও চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ বর্তমানে বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল। তাই আগামী অক্টোবর মাসে ব্যবসায়ী সংগঠন ও চেম্বারের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সুপারিশে ভারসাম্য আনা হবে।
সরকার ইতোমধ্যেই পোশাকশিল্পসহ ৪৫টি খাতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেছে। এবার পে কমিশন প্রস্তাব করবে, এসব খাতের মজুরি জাতীয় কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
কমিশনের পরিকল্পনায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা রাখা। এতে তাদের জন্য আলাদা ভাতা নির্ধারণ করা হবে। তবে এই সুবিধা সাধারণ সামরিক বা বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাবেন না।
বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী জাতীয় বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা পান। নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে কেবল তাদের জীবনমান উন্নত হবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়বে। তবে বেসরকারি খাতে বেতন কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি হওয়ায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ কেমন হয়, সেটি আগামী মাসগুলোতে বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
সরকারের অর্থ উপদেষ্টা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কোনো বিলম্ব ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালেই গেজেট আকারে নতুন পে–স্কেল কার্যকর হবে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রথম দিন থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে শুরু করবেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



