ছবি: সংগৃহীত
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থবছরের আট মাস পার হলেও সেই ধারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি সংস্থাটি। ফলে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে একদিকে বড় অঙ্কের ঘাটতি থাকলেও গত অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
এনবিআরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় শুল্ক-কর আদায়ে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও একই সময়ে আগের অর্থবছরের তুলনায় মোট রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
বুধবার (২৫ মার্চ) প্রকাশিত এনবিআরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব আহরণের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কম রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এত বড় ঘাটতি পূরণ করতে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রাজস্ব সংগ্রহের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হবে। কারণ সাধারণত অর্থবছরের শেষ তিন মাসে রাজস্ব আদায় তুলনামূলক বেশি হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আয়কর খাতে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি
প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব ঘাটতির সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে আয়কর খাত থেকে। এ সময়ে আয়কর খাতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই খাতেই ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আয়কর আদায়ে ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ রাজস্ব আদায় বাড়লেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
ভ্যাট খাতেও বড় ঘাটতি
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এই খাতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ৯৭ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা।
তবে ভ্যাট খাতে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা তিনটি প্রধান খাতের মধ্যে তুলনামূলক বেশি।
আমদানি শুল্কে তুলনামূলক ভালো আদায়
অন্যদিকে আমদানি শুল্ক খাতে তুলনামূলক ভালো রাজস্ব আদায় হয়েছে। আলোচ্য সময়ে এই খাত থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৯ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। যদিও এখানে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি, তবু অন্য খাতগুলোর তুলনায় ঘাটতি কিছুটা কম।
তবে আমদানি শুল্ক খাতে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারিতেও বড় ঘাটতি
চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসেও রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ওই মাসে শুল্ক-কর বাবদ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ৫১ কোটি টাকা। কিন্তু সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। ফলে ফেব্রুয়ারি মাসেই এককভাবে প্রায় ১১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তবে আগের বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় এই মাসে রাজস্ব আদায়ে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।
অর্থবছরের শুরুতে ছিল উচ্চ প্রবৃদ্ধি
এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আগের অর্থবছরের শুরুতে দেশে কোটা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। সেই প্রভাব রাজস্ব আদায়েও পড়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরের প্রথম দিকে তুলনামূলক বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। একক মাস হিসেবে জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ, আগস্টে ১৮ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ। ফলে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট রাজস্ব আদায়ে ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়।
মাঝামাঝি সময়ে প্রবৃদ্ধিতে ধাক্কা
তবে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধিতে ধাক্কা লাগে। অক্টোবর মাসে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৩ দশমিক ৩১ শতাংশে। এরপর নভেম্বর ও ডিসেম্বরে কিছুটা উন্নতি হলেও জানুয়ারিতে আবার বড় ধরনের ধাক্কা দেখা যায়।
একক মাস হিসেবে নভেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। কিন্তু জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৩ দশমিক ২১ শতাংশে, যা চলতি অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফেব্রুয়ারিতে আবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিললেও প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বাজেট লক্ষ্যমাত্রা ও পরিকল্পনা
চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় এনবিআরের মাধ্যমে শুল্ক-কর বাবদ ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে তা সংশোধন করে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
এছাড়া সামগ্রিকভাবে বাজেটে এনবিআরসহ সব উৎস থেকে মোট ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৯ শতাংশ। এর মধ্যে এনবিআরের বাইরের অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল।
শেষ প্রান্তিকের ওপর নির্ভরতা
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে সাধারণত রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই এনবিআর আশা করছে শেষ তিন মাসে রাজস্ব সংগ্রহের গতি বাড়তে পারে। তবে বর্তমান ঘাটতির পরিমাণ বিবেচনায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব আদায়ে একদিকে বড় ঘাটতি থাকলেও অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ের গতি কতটা বাড়ানো যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



