ছবি: সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ১৫ দফার একটি পরিকল্পনা পেশ করেছেন; যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি ও প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে। আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে যে, পরিকল্পনাটি পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান চলতি সপ্তাহেই জানিয়েছিল যে, তারা শান্তি আলোচনার আতিথেয়তা করতে বা ভেন্যু হতে প্রস্তুত।
ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন এবং তেহরান এই সপ্তাহে ‘‘অত্যন্ত ভালো এবং ফলপ্রসূ আলোচনা’’ করেছে। তবে ইরান ধারাবাহিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা করার কথা অস্বীকার করে আসছে। ট্রাম্পের এই দাবির জবাবে ইরানের নেতারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আসলে ‘‘নিজেদের সাথেই নিজেরা আলোচনা করছে’’।
ইরানের সাথে আলোচনা চলাকালীন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, এখন তার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও শেয়ার বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে, জাহাজ চলাচল ব্যাহত করছে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটাচ্ছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) পর্যন্ত শুধুমাত্র ইরানেই ১,৫০০ জন নিহত এবং ১৮,৫৫১ জন আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করার কয়েকদিন পর, দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) ঘোষণা করে যে, হরমুজ প্রণালী জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে তারা অনুমোদিত অল্প সংখ্যক জাহাজ— প্রধানত ভারত, পাকিস্তান এবং চীনের পতাকাবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে শুরু করেছে।
জাহাজ চলাচল ব্যহত হওয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সম্পদ এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানি হামলার ফলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলারের উপরে উঠে গেছে; যেখানে যুদ্ধপূর্ব আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ছিল প্রায় ৬৫ ডলার।
বুধবার ট্রাম্প প্রশাসনের ১৫ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর, বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে কিছুটা চাঙ্গা ভাব দেখা গেছে। এছাড়া তেলের দাম সামান্য কমেছে। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আদৌ কোনো আলোচনা হচ্ছে কি না, আর যদি হয়েও থাকে তবে যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে দুই পক্ষ সফলভাবে সমঝোতায় পৌঁছতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ, তাদের দাবিদাওয়াগুলোর মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়ে গেছে।
প্রত্যেক পক্ষ আসলে কী চায়, সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে তা নিচে দেওয়া হলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা পরিকল্পনায় কী আছে?
আল জাজিরা এবং আমেরিকান ও ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলো খবর দিয়েছে, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনার শর্তাবলি নির্ধারণের জন্য এক মাসের যুদ্ধবিরতিসহ ১৫ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার জন হেনড্রেন জানিয়েছেন, পাকিস্তান, মিশর এবং তুরস্ক বৃহস্পতিবারের মধ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তি বৈঠক আয়োজনের জন্য চাপ দিয়ে আসছে বলে জানা গেছে।
হেনড্রেন বলেন, ‘‘মার্কিন প্রশাসন যেমন শান্তি আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তেমনি তারা যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে।’’ তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশন থেকে প্রায় ৩,০০০ মার্কিন সেনা মোতায়েনের খবরের দিকে ইঙ্গিত করে এই মন্তব্য করেন।
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরাইল কিংবা মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত এই ১৫ দফা পরিকল্পনার বিস্তারিত নিশ্চিত করেনি। তবে ইসরাইলের চ্যানেল১২ এই পরিকল্পনার সম্ভাব্য ধারাগুলো প্রকাশের দাবি করেছে। এই প্রস্তাবগুলোর অনেকগুলোই ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে যা বলেছিল তার সাথে হুবহু মিলে যায়।
খবর অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার কিছু মূল পয়েন্টের মধ্যে রয়েছে:
৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি।
নাতাঞ্জ, ইসফাহান এবং ফোরদোতে অবস্থিত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা।
ইরানের পক্ষ থেকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার একটি স্থায়ী অঙ্গীকার।
ইরানের কাছে ইতিমধ্যে মজুদ থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কাছে হস্তান্তর করা এবং দেশটির অবশিষ্ট পারমাণবিক অবকাঠামোর সমস্ত উপাদান তদারকি করার জন্য আইএইএ-কে অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। এছাড়াও ইরানকে অবশ্যই দেশের অভ্যন্তরে আর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করার অঙ্গীকার করতে হবে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এবং সংখ্যার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ।
আঞ্চলিক প্রক্সি (সহযোগী গোষ্ঠী) সমূহের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা।
আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরানি হামলা বন্ধ করা।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া।
ইরানের ওপর আরোপিত সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সেই সাথে জাতিসংঘে থাকা সেই মেকানিজম বা ব্যবস্থাটি বন্ধ করা যার মাধ্যমে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব হয়।
ইরানের বুশেহর বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মার্কিন সহায়তা প্রদান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই আলোচনায় ইসরাইল কতটুকু একমত বা তাদের অনুমোদন আছে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট। বুধবার আল জাজিরার নিদা ইব্রাহিম বলেছেন, ‘‘পর্দার আড়ালে’’ ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত ১৫টি পয়েন্টের সাথে একমত, কিন্তু তারা ‘‘চিন্তিত যে এই চুক্তিটি সফল করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কতটা আপস করবেন’’।
ইব্রাহিম রিপোর্ট করেছেন, তারা (ইসরাইল) ভয় পাচ্ছে যে, এই ১৫টি পয়েন্ট একটি সম্ভাব্য আলোচনার ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং তার আগে এক মাসব্যাপী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে। ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো তার দেওয়া পয়েন্টগুলোর মধ্যে সবকটি নয়, বরং কিছু পয়েন্ট মেনে নেওয়ার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন।
যুদ্ধের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?
কিছু দাবি— যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয়গুলো আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র নাতাঞ্জ, ইসফাহান এবং ফোরদো পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল। এগুলো হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা, যেখানে ইউরেনিয়ামকে তাত্ত্বিকভাবে পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা সম্ভব।
২০১৫ সালে অন্যান্য দেশগুলোর সাথে ইরান যে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল, সেই শর্তানুসারে ইরান ইতিমধ্যেই বেসামরিক ব্যবহারের মাত্রার বাইরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করার অঙ্গীকার করেছিল এবং নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় ছিল। তবে তিন বছর পর ট্রাম্প একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সেই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন।
বুশেহর নামে যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে সহায়তা প্রদানের কথা যুক্তরাষ্ট্র তার ১৫ দফা পরিকল্পনায় উল্লেখ করেছে— সেটি তেহরান থেকে প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার (৪৬৫ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত। এটি ইরানের একমাত্র বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি রাশিয়ায় উৎপাদিত ইউরেনিয়াম দ্বারা পরিচালিত হয়।
যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য লক্ষ্যগুলোও পরিবর্তিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর মনোনিবেশ করেছিল, সেখানে বর্তমান যুদ্ধের সময় তারা ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই তেহরানে নিজ কার্যালয়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
এর এক সপ্তাহ পর, খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন, যে সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটন অসন্তুষ্ট ছিল।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিযুক্ত হওয়ার পর ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেছিলেন, ‘‘আমি মনে করি তারা একটি বড় ভুল করেছে। আমি জানি না এটি কতদিন টিকবে। আমার মনে হয় তারা ভুল করেছে।’’
যাই হোক, বর্তমানে প্রকাশিত ১৫ দফা পরিকল্পনায় শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বা রেজিম চেঞ্জের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই।
ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে?
ইরানি নেতারা দাবি করে আসছেন, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে আদতে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না।
ইরানের সামরিক নেতৃত্ব বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা করতে পারে না। কারণ, গত দুই বছরে চলমান আলোচনার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র দুইবার ইরানে হামলা চালিয়েছে।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির যৌথ সামরিক কমান্ডের প্রধান মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উপহাস করে বলেন, ‘‘আপনার (ট্রাম্প) অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের স্তর কী এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আপনি নিজের সাথেই নিজে আলোচনা করছেন?’’
আমাদের মতো মানুষ আপনাদের মতো মানুষের সাথে কখনোই এক হতে পারে না।
‘‘আমরা যেমনটা সব সময় বলে এসেছি... আমাদের মতো কেউ আপনাদের সাথে কোনো চুক্তিতে যাবে না। এখন নয়, কখনোই নয়।’’
যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ইরানের দাবিগুলো কী কী?
যদিও ইরানের আইআরজিসি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা করতে চায় না, তবুও শান্তিস্থাপনের জন্য ইরানের কিছু শর্ত রয়েছে। গত ১১ মার্চ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানের শর্তাবলী তুলে ধরেন।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এর একটি পোস্টে পেজেশকিয়ান লিখেন, তিনি রাশিয়া ও পাকিস্তানের নেতাদের সাথে কথা বলেছেন এবং ‘‘শান্তির প্রতি ইরানের অঙ্গীকার’’ পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
পেজেশকিয়ান লেখেন: জায়নবাদী শাসন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রজ্বলিত এই যুদ্ধ বন্ধ করার একমাত্র উপায় হলো— ইরানের বৈধ অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান, ক্ষতিপূরণ পরিশোধ এবং ভবিষ্যতে আগ্রাসন বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে দৃঢ় নিশ্চয়তা প্রদান।
বোঝা যাচ্ছে যে, ইরান তাদের ওপর আরোপিত সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চায়।
অতিরিক্তভাবে, ইরানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন 'প্রেস টিভি' সপ্তাহান্তে একজন ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে— তেহরান এই অঞ্চলে অবস্থিত সমস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে। পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে পারাপার নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা এমন একটি নতুন আইনি কাঠামো চায়; যা এই জলপথের ওপর ইরানের বর্তমান প্রকৃত আধিপত্যকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবে।
তবে, কাতারস্থ জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির জাইদুন আলকিনানি এই মাসের শুরুতে আল জাজিরাকে বলেছেন, এই যুদ্ধ আইআরজিসি এবং ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে কিছু পার্থক্য স্পষ্ট করে তুলেছে।
আলকিনানি বলেন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পেজেশকিয়ান ইরানের দাবিগুলো পূরণ হলে যুদ্ধ শেষ করার জন্য আলোচনায় কিছুটা প্রস্তুতি দেখিয়েছেন। তবে তিনি আরও যোগ করেন, আইআরজিসি’র জন্য এটি একটি অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ এবং এই বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যেন ভবিষ্যতে আর কখনও ইরানে হামলা না করে তা নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত লড়তে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
আলকিনানি বলেন, (আইআরজিসি এবং রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে) এই পার্থক্য এবং বিভাজনগুলো এই যুদ্ধের আগেও সব সময় ছিল, কিন্তু এখন আমরা এটি আরও বেশি লক্ষ্য করতে পারি। কারণ আইআরজিসি বিশ্বাস করে যে, এই আঞ্চলিক যুদ্ধের নেতৃত্বে সম্মুখ সারিতে থাকার অধিকার তাদেরই। আর এই কারণেই তাদের অনেক বক্তব্য এবং অবস্থান পেজেশকিয়ানের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে।
আলোচনা কি হতে পারে এবং হলে তার মূল লক্ষ্য কী হবে?
কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, ইরান সীমিত পর্যায়ে আলোচনা করতে আগ্রহী হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন মঙ্গলবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘‘পুর্ণাঙ্গ আলোচনা’’র পরিবর্তে কেবল ‘‘যোগাযোগ’’ হয়েছে।
সূত্রটি আরও যোগ করেছে, সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরান ‘‘টেকসই’’ প্রস্তাবগুলো শুনতে ইচ্ছুক।
সিএনএন সেই সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ‘‘ইরান এই মর্মে প্রয়োজনীয় সব গ্যারান্টি দিতে প্রস্তুত যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে তারা পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের অধিকারী।’’ সেই সূত্রটি আরও জানায়, ইরানের ওপর থেকে অবশ্যই সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
ইরান বিশ্বের অন্যতম কঠোর নিষেধাজ্ঞা কবলিত একটি দেশ। ১৯৭৯ সালে মার্কিন সমর্থিত ইরানের শাহকে নির্বাসন থেকে ফিরে আসা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তারপর গণভোটের মাধ্যমে দেশটি একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। এরপর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এটি দেশটির মানুষের আয়, তেলের রাজস্ব এবং এভিয়েশন বা বিমান চলাচল খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আলোচনা হওয়া সম্ভব, কারণ যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। তবে এই আলোচনা সফল হবে কি না, সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষেত্রে তারা সতর্ক।
ইরানি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ নাদের হাবিবী মঙ্গলবার আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘‘আমি বেশ কিছু কারণে আলোচনার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশ বলে মনে করি।’’
হাবিবী ব্যাখ্যা করেছেন, যুদ্ধের খরচ সব পক্ষের জন্যই অনেক বেশি হয়ে গেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো— যারা ইরানি হামলার শিকার হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে এবং প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদারদের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের দাম ও শেয়ারবাজারের ওপর প্রভাবের কারণে ট্রাম্প যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের চাপের মুখে রয়েছেন।
এছাড়াও তিনি ভোটারদের দিক থেকেও চাপের মুখে আছেন। আগামী নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদে শান্ত করতে হবে। জনমত জরিপগুলো ধারাবাহিকভাবে এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অধিকাংশ আমেরিকান ইরানের ওপর এই যুদ্ধ সমর্থন করে না।
নিজ দেশে হতাহত এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়ার পাশাপাশি ইরানি নেতারাও তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আঞ্চলিক ভূখণ্ড এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করার বিষয়ে চাপের মুখে পড়ছেন।
হাবিবী আরও যোগ করেন, মিশর, সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মতো বেশ কয়েকটি মধ্যস্থতাকারী দেশ ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের পথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, এটি আলোচনার পথ প্রশস্ত করে।
‘‘ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পতনের পথ আশা করেছিল। এখন তারা তাদের প্রত্যাশা পুনর্মূল্যায়ন করছে। তারা এখন একটি দীর্ঘ যুদ্ধের খরচ সম্পর্কে ভাবতে শুরু করেছে, যে যুদ্ধে ইরান ইসরাইলের ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে নিয়মিত আঘাত হানছে।’’
[আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার থেকে অনুদিত]
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



