ছবি: সংগৃহীত
রাজধানী ঢাকায় প্রবল শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চরম মাত্রায় দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট। প্রতিবারের মতো এবারও শীত মৌসুমের শুরু থেকেই গ্যাসের চাপ হ্রাস পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন লক্ষ লক্ষ নগরবাসী। বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় দৈনিক মাত্র এক ঘণ্টা – বিশেষ করে গভীর রাতের সময় – গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে প্রবলভাবে ব্যাহত করছে। এ পরিস্থিতিতে রান্না, গৃহস্থালি কাজ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার পাশাপাশি নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা।
রাজধানীর মগবাজার, হাতিরপুল, সেন্ট্রাল রোড, কাঁঠালবাগান, মালিবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ প্রায় সব এলাকার বাসিন্দাদের মুখেই এখন একটাই অভিযোগ – চুলায় গ্যাস নেই। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের খাবার পর্যন্ত সব ধরনের প্রস্তুতি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। অনেক পরিবার সন্ধ্যার আগেই রান্নার কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন, আবার অনেককে গ্যাসের অভাবে সারা দিন অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। গৃহবধূ জুলিয়ানা গোমেজের মতো অনেক নারীই এখন অতিথি আপ্যায়ন এড়িয়ে চলছেন। তিনি বলেন, "গ্যাসের অনিশ্চয়তার কারণে দুপুরে কাউকে খাবার দেয়ার সাহস হয় না। সব সময় চিন্তায় থাকি, গ্যাস পাব কি না।"
গ্যাসের এ সংকট কেবল রান্নাঘরেই সীমিত নেই; এর প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও। ক্ষুদ্র খাবারের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং রাস্তার ফুড ভেন্ডাররা সংকট মোকাবিলায় বাধ্য হচ্ছেন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বা সিলিন্ডারের উপর। কিন্তু সেখানেও নাগরিকদের জন্য অপেক্ষা করছে নতুন সংকট। সম্প্রতি এলপিজি সিলিন্ডারের বাজারেও দেখা দিয়েছে তীব্র অস্থিরতা ও মূল্যবৃদ্ধি। সরকারি মূল্য নির্ধারণ থাকলেও খুচরা পর্যায়ে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। গত রোববার (৪ জানুয়ারি) সরকারিভাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আরও অস্বস্তি।
এলপিজি সিলিন্ডার ভরার জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতে লক্ষণীয় দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। অনেক ভোক্তাকে তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা তাদের দৈনিক আয় ও কর্মঘণ্টাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। রিকশা, সিএনজি এবং মোটরসাইকেল চালকরাও সমান সমস্যার মুখোমুখি। গ্যাসের চাপ কম থাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোর কাজের গতি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এ সংকটের মুখে অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে বাইরের খাবারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, যা তাদের মাসিক বাজেটকে চাপের মধ্যে ফেলছে। একদিকে তারা গ্যাস বিল প্রদান করছেন, অন্যদিকে বাড়তি দামে সিলিন্ডারও কিনতে হচ্ছে – এই দুইয়ের সমন্বয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলোর জন্য তৈরি হয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপ।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী সাইদুল হাসান এ পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, "আমরা অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গ্যাস বণ্টন করে থাকি, যেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সার কারখানাগুলোকে প্রাথমিক গুরুত্ব দেয়া হয়। সেসব খাতের চাহিদা মেটানোর পরই আবাসিক এলাকায় গ্যাস সরবরাহের চেষ্টা করা হয়। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সত্ত্বেও চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না, যার প্রধান কারণ অবৈধ সংযোগ। আমরা অবৈধ লাইন কাটছি, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তারা আবার সেই সংযোগ ফিরিয়ে নিচ্ছে। প্রতিটি বাড়িতে নজরদারি করা আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।"
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জ্বালানি বিশ্লেষক ও আইইইএফএর প্রধান শফিকুল আলম বলেন, "দেশে প্রতিবছর জ্বালানির চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু সরবরাহ সেই হারে বাড়ছে না। এ অবস্থায় গ্যাসের অপচয় রোধে দক্ষ যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, এলপিজি'র মতো বিকল্প জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং তার মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে।"
জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, "ভবিষ্যতে আবাসিক এলাকায় গ্যাস সংযোগ সীমিত রাখার নীতি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সাথে, এলপিজি সরবরাহের একটি স্থিতিশীল ও নিয়মিত চ্যানেল তৈরি করতে হবে, যাতে বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে না পারে। সরকারকে নজরদারি জোরদার করতে হবে।"
বর্তমান সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে খাবারের সময়ের অনিশ্চয়তা, যা শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে কষ্টদায়ক হয়ে উঠছে। অনেক কর্মজীবী ব্যক্তিও অফিস থেকে ফিরে গ্যাসের অভাবে রান্না করতে না পেরে হয় উপোস থাকছেন, নয়তো অতিরিক্ত ব্যয় করে বাইরের খাবার কিনছেন।
এ পরিস্থিতিতে নগরবাসীর দাবি, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধানে কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তারা চান, গ্যাস সরবরাহের সময়সূচি আরও নিয়মিত ও স্বচ্ছ হোক, এলপিজি সিলিন্ডারের বাজার দর নিয়ন্ত্রণে জোরদার নজরদারি করা হোক এবং দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের উৎস বৃদ্ধি ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার আনা হোক। নগরবাসীর প্রত্যাশা, শীতের এই কষ্ট যেন তাদের নিত্যসঙ্গী না হয়ে দাঁড়ায়, এবং একটি আধুনিক রাজধানীর জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সুবিধা যেন তারা নিশ্চিন্তে ভোগ করতে পারেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



