ছবি: সংগৃহীত
আগামী দিনে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসন আমলের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অনুসরণ করবে বিএনপি। সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা; এ ছাড়া দুর্নীতি রোধ, আইনের শাসন ও জবাবদিহি—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত না করা গেলে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল করা সম্ভব নয় বলে মনে করে দলটি। আর প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর এবং উপরাষ্ট্রপতি পদসহ সংসদের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠাসহ পাঁচটি ভাগে ৫১টি দফার কথা উল্লেখ করে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণাকালে এসব কথা বলেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় দিন আগে এ ইশতেহার ঘোষণা করেন তিনি। এদিন বিকেল সোয়া ৪টার দিকে শুরু করে টানা দুই ঘণ্টা ইশতেহার ষোষণা করেন বিএনপির প্রধান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সঞ্চালনা করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন।
গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে ইশতেহারের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন তারেক রহমান।
তিনি উল্লেখ করেন, এই ইশতেহার প্রতিশ্রুতি নয়; এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা।
বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে তারেক রহমান কী কী পদক্ষেপ নেবেন তার একটি বিষদ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি রোধ, আইনের শাসন ও জবাবদিহি—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত না করা গেলে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল করা সম্ভব নয়।’
রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম দেখভাল করার জন্য ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এ ছাড়া বিচার বিভাগ পৃথক্করণ এবং ন্যায়বিচার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণে মেধা ও সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
কওমি সনদ স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হবে।
এ ছাড়া সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে।
গণমাধ্যমকর্মীদের কাজের সুরক্ষা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিএনপি নির্ভীক ও পক্ষপাতহীন সাংবাদিকতাকে সম্মান জানাবে। জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠনে নানামুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিকীকরণের বাইরে রাখা হবে।
বিদ্যুৎ খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা এবং সঞ্চালন লাইন ২০ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণ করা হবে। আইসিটি খাতকে দ্রুত সম্প্রসারণ করে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। উদ্ভাবন এবং আইসিটি পরিষেবা রপ্তানিকে সর্বোচ্চ উৎসাহিত করে দেশের জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
বুলেট ট্রেন সংযোগ, রাইড শেয়ারিং সাইকেল সেবা চালু, নদী ও সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে নৌযোগাযোগ উন্নয়নসহ নানা প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান।
তারেক রহমান উল্লেখ করেন, দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে। বিএনপি বিশ্বাস করে, দল-মত-ধর্ম যার যার, কিন্তু রাষ্ট্রে সবার নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ৩১ দফার মাধ্যমে একটি প্রস্তাব জাতির সামনে অনেক আগেই দিয়েছিলাম। সেই প্রস্তাবটি হচ্ছে, যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন, তাঁর পদের মেয়াদ ১০ বছরের বেশি হবে না। কাজেই এই কৃতিত্ব অবশ্যই আমরা গ্রহণ করতে চাই। ইনশাআল্লাহ আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে এই বিষয়টি প্রবর্তন করব যে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কার্যকাল অতিবাহিত করতে পারবেন।’
রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে বিএনপির ইশতেহারে আরো বলা হয়, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটানোই লক্ষ্য। আমাদের একটাই পরিচয়—আমরা সবাই বাংলাদেশি। বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ের মানুষ, সমতলের মানুষ, ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবাই মিলে গড়ে তোলা হবে জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ড জাতীয় সত্তা এবং ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠন করা হবে।’
শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত অথবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত (যা আগে ঘটবে ভিত্তিতে) বিশেষ আর্থিক ভাতা প্রদান করা হবে বলে বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এ ছাড়া কৃষকদের জন্য থাকবে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ। সার, বীজ, তেল, বিদ্যুৎ, সেচের পানিসহ কৃষি উপকরণের দাম বেড়েই চলছে। কিন্তু খেটে খাওয়া কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। জনজীবনে কোনো স্বস্তি নেই। তাই শস্য, ফসল, মৎস্য, ও পশুপালন খাতে গৃহীত ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ-আসল মওকুফ করা হয়েছিল, যা কৃষকদের কষ্ট লাঘব করে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।
রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য আনা হবে। সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও আইসিটি শিল্প শক্তিশালী করার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক পণ্য, ওষুধ, চামড়া ও জুতা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি শিল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করা হবে। তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’কে বৈশ্বিক বাজারে আরো শক্ত অবস্থানে তুলে ধরা হবে, যেন প্রতিটি সেক্টরে কর্মসংস্থানের জোয়ার সৃষ্টি হয়।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ও আসন্ন লংজেভিটি ডিভিডেন্ডের সুবিধা অর্জনে অগ্রাধিকার : বাংলাদেশে জনসংখ্যার দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে বিএনপি বদ্ধপরিকর। ১৫-৬৪ বছরের কর্মক্ষম জনশক্তির জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা রয়েছে, যা ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। এই কর্মক্ষম যুব জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, বাজারভিত্তিক দক্ষতা ও কর্মসংস্থান ও ব্যাপক কর্মমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে কর্মক্ষম জনসম্পদের ইতিবাচক সম্ভাবনা ও লভ্যাংশ দ্রুত আদায় নিশ্চিত করা হবে। অন্যদিকে ২০৪০ সাল ও তার পরবর্তী সময়কালে দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। তাঁদের অবহেলা না করে; বরং তাঁদের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা, স্বেচ্ছাব্রতী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রাখা এবং সামাজিক সুরক্ষার আওতায় রেখে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন সাধন করা হবে।
ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু : শিক্ষা খাতে ডিজিটাল সুবিধা বাড়াতে স্কুল, কলেজ, ক্যাফে ও লাইব্রেরিতে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির, যা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার কাজে সহায়তা করবে এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখবে।
বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস প্রদান : শিক্ষার্থীদের সরকারিভাবে ‘বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস’ প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানো, সামাজিক মর্যাদার স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল এবং মাদরাসা শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন : অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামে ব্যাবহারিক এবং কারিগরি শিক্ষাকে প্রধান্য দেওয়া হবে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ ৯টি বিষয়ে প্রধান প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন, ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সৃংস্কৃতি ও সংহতি।
নির্বাচনী অঙ্গীকার : প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো হলো : প্রান্তিক ও নিন্ম আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থ সেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে।
এ ছাড়া কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বিমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন।
দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সমপ্রসারণ করা হবে। আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে। তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা সমপ্রসারণ করা হবে। পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক সমপ্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘ মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সমপ্রসারণ করা হবে।
বলা হয়, বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই আমাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা-এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে—সবার আগে বাংলাদেশ।
দেশ ও জনগণের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি : তারেক রহমান বলেন, আমাদের ফরেন পলিসিটা আমার দেশের স্বার্থ, দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে যাদের বন্ধুত্ব সহযোগিতা পেলে আমরা আমাদের দেশে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারব, আমার দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারব, আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী করতে পারব, পাশাপাশি অবশ্যই আমার দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখবে। এটার ভিত্তিতেই আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত করব।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন করতে চাই : তারেক রহমান বলেন, আমাদের নিজের দেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এই জনসংখ্যার কর্মসংস্থান ব্যবস্থা, খাদ্যের সংস্থান, চিকিৎসাব্যবস্থা সব কিছু করতে হবে। আমাদের দেশে প্রায় ১.২ মিলিয়নের মতো রোহিঙ্গা আছে। তারাও মানুষ। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অবশ্যই তাদের দেশে যে অবস্থা, আমরা এখানে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। অবশ্যই আমরা তাদের দেখব। কিন্তু আমরা চাইব যে তাদের এলাকায় তাদের ঘরে তাদের জন্য সেফ একটা সিচুয়েশন তৈরি হোক এবং ধীরে ধীরে তারা তাদের এলাকায় ফিরে যাক। অর্থাৎ আমরা রোহিঙ্গা সেইফ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে চাই।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে নদ-নদীর পানি সমস্যার সমাধান চাই : তারেক রহমান বলেন, আমাদের পদ্মা নদী, তিস্তা নদীসহ বিভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে আমাদের কিছু অসুবিধা আছে। আমরা চাই যাদের সঙ্গে আমাদের এই অসুবিধা আছে, তাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে চাই, যাতে আমার দেশের মানুষ তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে পারে।
‘প্রবাসীদের দিকে নজর দিতে হবে’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে মোর অ্যাক্টিভেট করার মাধ্যমে আমাদের যে প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বিদেশে আছেন, তাঁরা যাতে আরো বেটার-ভাবে ট্রিটেড হন, সে বিষয়ে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করতে চাই।’
নির্বাচনী ইশতেহারে বিদেশে নতুন বাজার অনুসন্ধান, সীমান্ত নিরাপত্তা, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি গঠন, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর ও শক্তিশালী করা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারি বৃদ্ধি, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব প্রদান প্রভৃতি বিষয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরা হয় স্পষ্টভাবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চীন, পাকিস্তান, ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূত ও যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাজ্যসহ ৩৮টি দেশের প্রতিনিধি। এ ছাড়া ইশতেহার অনুষ্ঠানে যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান, কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
শরিক দলের নেতাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণফোরাম সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জাগপার সভাপতি খন্দকার লুত্ফুর রহমান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুর রব ইউসুফীসহ সিনিয়র নেতারা ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি নেতাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শাসমুজ্জামান দুদু, আসাদুজ্জামান রিপন, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর, গোলাম আকবর খন্দকার, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, নজমুল হক নান্নু, নাজিম উদ্দিন আলম, সুজা উদ্দিন, এস এম ফজলুল হক, বিজন কান্তি সরকার ও আমিনুর রশিদ ইয়াছিন ছিলেন।
এ ছাড়া অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, অধ্যাপক আ ন ম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক কামরুল আহসান, অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকরাও উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। সেই হিসেবে এটিই তাঁর প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা। পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সে সময় তিনিই প্রতিটি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ নিলেও সেই সময় বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি ছিলেন। ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর গুলশানের লেকশোর হোটেলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শেখ হাসিনার অধীনে দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি।
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধারে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং আস্থা পুনঃস্থাপন না হলে বিনিয়োগ, শিল্প ও কর্মসংস্থানে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না। পাশাপাশি রপ্তানি ও এসএমই খাতে টার্গেটেড সহায়তা প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তাসকিন আহমেদ বলেন, নীতি-স্থিতিশীলতা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি। একই সঙ্গে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করা, করনীতি সহজীকরণ এবং চুক্তি বাস্তবায়নে আস্থা সৃষ্টি না হলে টেকসই বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ সম্ভব হবে না।
ডিসিসিআই সভাপতি থ্রি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসায়ীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং উন্নত প্রযুক্তির অভাবের কথা উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিগত দিনের রাজনৈতিক ইশতেহারের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল ছিল না। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই জাতি হতাশায় ভুগছে। কাগুজে ইশতেহার নয়, বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা। রাজনৈতিক লুটপাট বন্ধ না হলে কোনো সমস্যারই টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘কথার রাজনীতি নয়, এখন প্রয়োজন কাজের রাজনীতি। অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয় বলেই মানুষ নতুন প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান। তবে যদি সত্যিকারের অর্থে জাতীয় কমিটমেন্ট ও সদিচ্ছা থাকে, তাহলে পরিবর্তন অসম্ভব নয়। রাজনৈতিক দুর্নীতি ও লুটপাটই এত দিন সমস্যাগুলোর সমাধানকে বাধাগ্রস্ত করেছে, এখন সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।’
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



