ছবি: সংগৃহীত
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, একটি রাজনৈতিক দল যাদের একটি অন্য পরিচয় আছে, জনগণ যাদের গুপ্ত পরিচয়ে চেনে। আপনারা চেনেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে কারা সেই গুপ্ত? চেনেন আপনারা? উপস্থিত জনতা সমন্বরে বলে ওঠে ‘জামায়াত’। জবাবে তারেক বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে এক নতুন জালেমের আবির্ভাব হয়েছে। এই গুপ্ত সংগঠনের ব্যক্তিরা নতুন জালেমরূপে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশের জনগণের কাছে।
সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘কাজেই এই গুপ্তদের বিরুদ্ধে আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে, সজাগ থাকতে হবে। যারা দেশের মানুষকে সম্মান করতে জানে না, যারা পরিকল্পনা করে রাখে ১২ ফেব্রুয়ারির পর থেকে তারা জনগণকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবে, তাদের উচিত শিক্ষা আপনাদেরই দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এই গুপ্তরা সেই ’৭১ সাল, সেই ’৮৬ সাল। ইতিহাস যদি আমরা দেখি, সব সময় যারা দেশ থেকে পালিয়ে যায় তাদের সঙ্গে সব সময় এ-পাশ না হলে ও-পাশ, এ-পিঠ না হয় ও-পিঠ হিসেবে তারা ছিল।
কাজেই তাদের কাছ থেকে দেশের মানুষ ভালো কিছু আশা করতে পারে না।’ গতকাল বুধবার দুপুরে বরিশালে বেলস পার্কে মহানগর বিএনপি আয়োজিত এক নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তারেক রহমান।
বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুকের সভাপতিত্বে, সদস্যসচিব জিয়া উদ্দিন সিকদারের সঞ্চালনায় নির্বাচনী সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন, আবুল হোসেন খান, রাজিব আহসান, ইসরাত জাহান ইলেন ভুট্টো, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, বিলকিস জাহান শিরিন, নুরুল ইসলাম মনি, মজিবর রহমান সরওয়ার, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ, আহমেদ মঞ্জুর সুমন সোহেল, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও বেগম সেলিমা রহমান প্রমুখ।
তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে বরিশাল মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়।
ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে দুপুর ১২টায় বরিশালে নামেন তারেক রহমান। জনতার স্রোতের মধ্য দিয়ে সেখান থেকে মাঠে আসেন ১২টা ২৬ মিনিটে।
তারেক রহমান বলেন, ‘এই বাংলাদেশে আবহমান কাল ধরে, হাজারো বছর ধরে নারী-পুরুষ সকলে মিলে মাঠে কাজ করেন। বাংলাদেশে যেমন কৃষক ভাইয়েরা কাজ করেন মাঠে, একইভাবে আমরা জানি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষানি বোনরাও মাঠে কাজ করেন। শুধু মাঠেই নয়, বিভিন্ন কল-কারখানায় আমরা দেখেছি আমাদের মায়েরা, আমাদের বোনেরা, আমাদের নারীরা পুরুষের পাশাপাশি মিলে কাজ করেন।
যে গার্মেন্টশিল্প নিয়ে সমগ্র পৃথিবীতে আমরা গৌরব বোধ করি, সেই গার্মেন্টশিল্প টিকিয়ে রেখেছেন এই দেশের নারীসমাজ, এই দেশের মা-বোনেরা।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আজ অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে দেখছি, অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে দেখছি, এই যে নতুন জালেমদের নেতা, তিনি দুই দিন আগে প্রকাশ্যে বলেছেন, বাংলাদেশের নারীদের নিয়ে তিনি একটি অত্যন্ত কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেই ব্যক্তি বা যেই দলের দেশের মা-বোনদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই, যেই নেতা, যেই দলের নেতাকর্মীদের নিজের দেশের মা-বোনদের কষ্টের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান নেই, তাদের কাছ থেকে আর যাই হোক, বাংলাদেশ কখনো অগ্রগতি আশা করতে পারে না। তাদের কাছ থেকে আর যাই হোক, বাংলাদেশের মানুষ আত্মসম্মানমূলক, মর্যাদাপূর্ণ আচরণ আশা করতে পারে না।’
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্ত্রী বিবি খাদিজার কর্মময় জীবন তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘এরা (জামায়াতে ইসলামী) বলে ইসলামের রাজনীতি করে। অথচ নবীর স্ত্রী নিজে যেখানে একজন কর্মজীবী মহিলা ছিলেন, সেখানে কেমন করে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা এবং কেমন করে সেই রাজনৈতিক দলটি তাবৎ বাংলাদেশের নারীসমাজকে এমন একটি কলঙ্কিত শব্দে জর্জরিত করল?’
তিনি বলেন, ‘কাজেই আমরা ইসলাম ধর্ম বলি, আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থান বলি, সকল জায়গায় নারীদের শক্তিশালী অবস্থান আছে। এটা আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারব না, এই নারীদের পেছনে রেখে, এই নারীদের ঘরে বন্দি রেখে, কোনোভাবেই বাংলাদেশ সামনে যেতে পারবে না। সে জন্যই দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তিনি বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করে দিয়েছিলেন।’
দেশ গড়তে হলে নারী-পুরুষ সবাইকে লাগবে : তারেক রহমান বলেন, ‘আজ সময় এসেছে আমাদের দেশ গড়ার। দেশ যদি গড়তে হয় প্রতিটি নারী-পুরুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। তা না হলে এই দেশকে আমরা আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব না। সে জন্যই আমরা এই নারীদের বিশেষ করে গ্রামের খেটে খাওয়া নারী, শহরের খেটে খাওয়া নারী, যাঁরা কর্মজীবী তাঁরাসহ সকল গৃহিণীর কাছে, সকল পরিবারের মায়েদের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। যার মাধ্যমে আমরা এই নারীদের ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে পারি। যেন তাঁরা পুরুষের পাশাপাশি পরিবারে, সমাজে, দেশে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেন।’
বরিশালের উন্নয়ন করতে হবে : ১৯৯৩ সালে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বরিশালকে বিভাগ ঘোষণার কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ‘এই এলাকায় ১৯৭৮ সালে পল্লী বিদ্যুতের লাইন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। তারপর নদীর পানি অনেক দূর গড়িয়েছে। আমরা এলাকার উন্নয়নে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করেছি। কিন্তু আরো বহু কাজ করা বাকি। যেমন—বরিশাল-ভোলা ব্রিজ, এই কাজটি আমাদের করতে হবে। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ, সেটিকে এলাকার মানুষের চিকিৎসার জন্য উন্নত করতে হবে। ভোলাতে মেডিক্যাল কলেজের কাজে আমাদের হাত দিতে হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা এই এলাকার নদীভাঙন সমস্যা। এই বিশাল এলাকায় বেড়িবাঁধ দিতে হবে। এই কাজগুলো যদি করতে হয় তাহলে অবশ্যই আপনাদের সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এসব সমস্যার সমাধান বিএনপি তখনই করতে পারবে, যখন আপনারা ধানের শীষকে নির্বাচিত করবেন। তাহলেই আমরা এই কাজ করতে পারব ইনশাআল্লাহ।’
ভুয়া ব্যালট পেপার, সিল ছাপানো হচ্ছে : তারেক রহমান বলেন, ‘গত কদিন ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার নিউজে আমরা কিছু খবর দেখতে পাচ্ছি। ওই যে যারা নতুন জালেম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, ওই যে যাদেরকে বাংলাদেশের মানুষ গুপ্ত হিসেবে চেনে, আমরা দেখেছি কিভাবে তাদের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া সিল তৈরি করছে, আমরা বিভিন্নভাবে শুনতে পাচ্ছি, তাদের পরিচিত যেসব প্রেস আছে সেখানে তারা ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে। যেটি তারা পকেটে করে নিয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, আমরা এর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, বিশেষ করে নিরীহ মা-বোন যাঁরা আছেন, তাঁদের কাছে গিয়ে তারা এনআইডি নম্বর নিচ্ছে, তাঁদের কাছে গিয়ে তারা বিকাশ নম্বর নিচ্ছে। এই গুপ্তের দল, এই জালেমের দল বলে তারা নাকি সৎ মানুষের শাসন কায়েম করবে। নির্বাচনের আগেই আপনারা জাল ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছেন, নির্বাচনের আগেই আপনাদের লোকজন এনআইডি নম্বর নিয়ে যাচ্ছেন মা-বোনদের কাছ থেকে। প্রথমেই তো আপনারা অনৈতিক কাজ শুরু করেছেন। অনৈতিক কাজ দিয়ে আপনারা মানুষের ভোটকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছেন। যাদের ভোটের শুরুটাই অনৈতিক কাজ দিয়ে, তারা কী করে সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে?’
ভোট হাইজ্যাক করতে যেন না পারে, সতর্ক থাকুন : তারেক রহমান বলেন, ‘যারা মা-বোনদের অপমান করার পর বলছে তারা এটা করে নাই, বলে তাদের আইডি হ্যাক হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের কথা অনুযায়ী আইডি হ্যাক হয় নাই। যারা একটি অপরাধকে ঢাকার জন্য মিথ্যা কথা বলে, আর যাই হোক তারা সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে না। কাজেই এদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আপনাদের সজাগ থাকতে হবে। যাতে ১২ ফেব্রুয়ারি আপনার অধিকার কেউ হাইজ্যাক করে নিয়ে যেতে না পারে।’
মা-বোনের প্রতি যাদের ন্যূনতম সম্মান নেই, তাদের হাতে দেশ নিরাপদ নয় : ফরিদপুরে বিএনপির বিভাগীয় নির্বাচনী সমাবেশ রূপ নেয় দলটির রাজনৈতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘোষণা মঞ্চে। সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভোটাধিকার, নারী নিরাপত্তা, সুশাসন ও আঞ্চলিক উন্নয়ন নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। গতকাল বুধবার বিকেলে ফরিদপুর বিভাগীয় (সাংগঠনিক) বিএনপির আয়োজনে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘নিজের দেশের মা-বোনদের সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম সম্মানবোধ নেই, তাদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়।’
মানুষের উপকার হলে ফরিদপুরকে বিভাগ করা হবে : ফরিদপুরকে বিভাগ করার জন্য জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনারা দাবি করেছেন ফরিদপুরকে বিভাগ করার জন্য। মানুষের উপকার হলে আপনাদের দাবি অনুযায়ী তাই করা হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক এলাকায় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কল-কারখানা করব। যাতে তারা সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে। নারীদের পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে যেতে পারব না। এ জন্য নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেব। তার মাধ্যমে নারীরা, খেটে-খাওয়া পরিবারগুলো কিছু সহায়তা পাবে।’ বিএনপিকে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষ ভোট দিলে কী কী করা হবে, আমরা তা পরিকল্পনা করেছি। এই এলাকার একটি অন্যতম সমস্যা নদীভাঙন। কৃষিপ্রধান এই এলাকায় আমরা নদীভাঙন রোধ করতে পারলে এই এলাকার অন্যতম সেরা ফসল পাটকে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা পাব। দলটির প্রতিশ্রুত ‘কৃষক কার্ডের’ সুবিধার কথা তুলে ধরেন তিনি।
ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলীর সভাপতিত্বে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়ার সঞ্চালনায় এ সময় ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার ১৫টি আসনের বিএনপি প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন তারেক রহমান।
সমাবেশে বক্তব্য দেন ধানের শীষের প্রার্থী হারুনুর আল রশিদ, আলী নওয়াজ মোহাম্মদ খৈয়াম, খন্দকার নাসিরুল হক, শামা ওবায়েদ, নায়েবা ইউসুফ, শহীদুল ইসলাম বাবুল, এস এম জিলানী, ডা. কে এম বাবর, সেলিমুজ্জামান সেলিম, নাদিরা মিটু চৌধুরী, জাহানদালী জাহান, আনিসুর রহমান খোকন, লায়ন সাঈদ আসলাম, শফিকুর রহমান কিরণ, মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু প্রমুখ।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



