ছবি: সংগৃহীত
ইঞ্জিনের গর্জন নেই, নেই পণ্যবাহী ট্রাকের চিরচেনা জট। দেশের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের মূল তিনটি টার্মিনাল গতকাল বুধবারও ছিল জনশূন্য। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতিতে ভূতুড়ে নীরবতা নেমে এসেছে বন্দরজুড়ে। জেটির বিশালাকার গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো আকাশের দিকে মুখ করে স্থির দাঁড়িয়ে আছে—তা থেকে মনে হয় পুরো বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য থমকে আছে।
গতকাল বুধবার সকালে এই বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, বন্দরে মানুষের আনাগোনা নেই। টার্মিনালের ভেতরে পণ্য ওঠানো-নামানোর অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো অলস পড়ে আছে। জেটিতে থাকা ১৪টি জাহাজ পণ্য খালাস করতে না পেরে আটকা পড়েছে।
অথচ বন্দরে ২৪ ঘণ্টা সচল থাকত জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও এনসিটি।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার থেকে নতুন জাহাজ জেটিতে ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। এমনকি বহির্নোঙরে যাওয়ার জন্য তৈরি জাহাজগুলোও বন্দর ত্যাগ করতে পারেনি। আন্দোলনকারীরা বন্দরের প্রতিটি প্রবেশপথে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। এ কারণে কোনো শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি।
ফলে জেটি থেকে ইয়ার্ড—সর্বত্রই ছিল জনমানবহীন। স্বাভাবিক সময়ে বন্দরের ৪ নম্বর গেটের সামনে রপ্তানি ও আমদানি পণ্যবাহী লরি ও ট্রেইলারের দীর্ঘ সারি থাকে। গতকাল গেটের দুই পাশ ছিল তালাবদ্ধ। মাঝে মধ্যে দু-একটি ব্যক্তিগত গাড়ি যাতায়াতের জন্য ছোট দরজা খোলা হলেও পণ্যবাহী কোনো যানবাহনের দেখা মেলেনি। গতকাল পর্যন্ত জেটি ও বহির্নোঙরে ১৪২টি জাহাজ আটকা পড়েছিল।
এর মধ্যে উল্লেযোগ্যসংখ্যক জাহাজে রয়েছে চিনি, ভোজ্যতেল ও ডালের মতো পণ্য। আমদানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে টার্মিনাল অচল থাকলে বাজারে সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে ও পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। রমজান মাসে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেবে ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।
বেসরকারি ডিপোগুলোয় গতকাল পর্যন্ত ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের লম্বার কনটেইনারের একক) রপ্তানি কনটেইনার আটকা ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদেশি জাহাজগুলো যদি পণ্য না নিয়ে বন্দর ত্যাগ করতে শুরু করে, তবে তৈরি পোশাক খাতের শত শত কোটি টাকার ক্রয়াদেশ বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হবে। স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার একক (টিইইউস) পণ্যবাহী কনটেইনার খালাস হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। কিন্তু গত শনিবার থেকে বন্দরে শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতি শুরুর পর থেকে এই চিত্র বদলে গেছে। গত শনিবার কনটেইনার খালাস কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৭৫০ টিইইউসে। গত রবি ও সোমবার তা আরো কমে এক হাজার ৬৮৪ এবং এক হাজার ২৩০ টিইইউসে ঠেকেছে। গতকাল বুধবার বন্দরে কনটেইনার ছিল ৩৭ হাজার ৩১২ টিইইউস।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দেশের মোট রাজস্বের বিশাল অংশ জোগান দেয়। প্রতিদিন গড়ে বন্দরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকে ১৭০ কোটি টাকা। কর্মবিরতির দরুন দৈনিক রাজস্ব আদায়ের হার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে।
বন্দরের ধারণক্ষমতা যেখানে প্রায় ৫৯ হাজার কনটেইনার, সেখানে বর্তমানে জেটি, টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে আটকা পড়েছে ৫২ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কনটেইনার। বন্দরের বহির্নোঙর ও জেটি মিলিয়ে ১৪২টি জাহাজ অলস বসে আছে। প্রধান তিনটি টার্মিনালের জেটিতে ১৪টি জাহাজ (১০টি কনটেইনারবাহী ও চারটি খোলা পণ্যবাহী) গত মঙ্গলবার থেকে নড়তে পারেনি।
বেসরকারি ডিপো বা অফডকগুলো থেকে সাধারণত প্রতিদিন দুই হাজার ৮০০টি রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে পাঠানো হয়। বর্তমানে তা নেমেছে এক হাজার ৪০০টিতে (৫০% হ্রাস)। ২১টি বেসরকারি ডিপোতে বর্তমানে ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস রপ্তানি পণ্য এবং সাত হাজার ৯১০ টিইইউস আমদানি পণ্য আটকা পড়ে আছে। সবচেয়ে বড় জট তৈরি হয়েছে খালি কনটেইনারে, যার সংখ্যা গতকাল পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৪৯৬টিতে। ডিপো মালিক সমিতির (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার গতকাল বলেন, আন্দোলনের তিন দিন বিকেল ৪টার পর কিছুটা কাজ করতে পেরেছি। টানা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির ফলে সংকট বাড়ছে। সময়মতো রপ্তানি কনটেইনার পাঠাতে না পারলে সেটি রেখে বন্দর ত্যাগ করবে বিদেশি জাহাজ। এতে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য সংকট তৈরি করবে।
এদিকে, আন্দোলনের মুখে বন্দর কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে ৩১ শ্রমিক-কর্মচারীকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করেছে। তবে এতে আন্দোলন দমানোর পরিবর্তে তা আরো তীব্র হয়েছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এনসিটি ইজারা বাতিল ও বদলি করা কর্মচারীদের বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত এই টার্মিনালগুলো এভাবেই জনশূন্য থাকবে।’
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে বসে এই সংকট দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ আন্দোলন আরো দীর্ঘ হলে দেশের অর্থনীতিতে তা আরো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



