ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের কিছু এলাকায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট চাওয়ার কারণে মায়েদের অপমান করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ‘মায়েদের কি অধিকার নেই? যারা মায়ের গায়ে হাত তোলে, তারা মানুষ নাকি অন্য কোনো প্রজাতি?’
গতকাল রবিবার দুপুর ১টায় জামালপুর শহরের সিংহজানি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জেলা জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় সবাইকে নিজ নিজ কর্মসূচি ও পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। হুমকি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক নয়।
তিনি মায়েদের উদ্দেশে বলেন, কেউ কটু কথা বললে আত্মমর্যাদা নিয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি মায়েদের বলছি, আমরা আপনাদের সন্তান। আপনাদের অপমান আমরা সহ্য করব না, একদম সাফ কথা, সহ্য করব না। যদি কোনো দুর্বৃত্ত আপনাদের কটু কথা বলে, চোখে চোখ রেখে বলবেন, ‘আমি মা, আমি তোমাকে পরোয়া করি না, আমি পরোয়া করি আল্লাহকে।
তিনি আরো বলেন, “কোনো কোনো জায়গায় ধমক দেওয়া হচ্ছে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে সেদিন কেন্দ্রে যেও না। সেখানেও চোখে চোখ রেখে বলে দেবেন, ‘আমি যাব, পারলে তুমি ঠেকাও।’ তখন বিড়ালেরা পেছনের দরজা দিয়ে পালাবে। মায়ের সন্তানদের বলব, সেদিন মায়ের পাশে পাহারাদার হয়ে থাকবেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ মা বলেছেন, আমাদের নিরাপত্তার জন্য ১১ দলকে চাই, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামকে চাই। মায়েরা আমাদের বড় ঋণী করে ফেলেছেন। দোয়া করবেন, যেন আপনাদের এই ঋণ যোগ্যতার সঙ্গে আমরা পরিশোধ করতে পারি।’
যুবক ও কর্মসংস্থান নিয়ে বক্তব্য : যুবকদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে ৬২ শতাংশই যুবক। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা যুবকদের হাতে ভাতা দিয়ে অপমান করব না, হাতে কাজ তুলে দেব।’
তিনি অর্থনৈতিক অঞ্চল, রেললাইন, নদীভাঙন প্রতিরোধ ও নকশিপল্লী গড়ে তুলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, ‘মেডিক্যাল কলেজসহ এখানে যে দাবিগুলো তোলা হয়েছে, সবই যৌক্তিক। কথা দিচ্ছি আপনাদের টাকা আপনাদের কাজেই লাগবে। এই টাকাতেও হাত দেব না, চুরি করব না, লুটপাট করব না, ব্যাংক খালি করব না, চাঁদাবাজি করব না, দুর্নীতি করতে দেব না। আপনাদের কল্যাণেই এই অর্থ ব্যয় হবে।’
জামালপুরের পাঁচটি সংসদীয় আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের এই ভাইয়েরা যদি নির্বাচিত হন, তাহলে বছরে অন্তত একবার তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের সব সদস্যের আর্থিক হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক থাকবে।’
সমাবেশের শেষ পর্যায়ে জামালপুরের পাঁচটি আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন তিনি। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মুহাম্মদ আব্দুল সাত্তার।
শেরপুরে জনসভা : এদিকে দুপুরে শেরপুর শহরের শহীদ দারোগ আলী পৌরপার্ক মাঠে জামায়াতে ইসলামীর পৃথক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সবার জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কর্ম অনুযায়ী বেতন-ভাতা এবং নারীর মর্যাদা সমুন্নত রাখা হবে। প্রতিটি হাতকে কর্মক্ষম সম্পদে পরিণত করা হবে।
তিনি বলেন, জামায়াত হিংসাত্মক রাজনীতি চায় না। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য খুন, মারামারি ও নারীদের ওপর হামলা চালায়, তাদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়। তিনি এসব কর্মকাণ্ডকে পতিত ফ্যাসিস্ট আচরণের সঙ্গে তুলনা করেন।
নিজের ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রচারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। প্রায় সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর অ্যাকাউন্টটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ধর্ম-বর্ণ ও লিঙ্গভেদ ভুলে সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ গড়তে চায় জামায়াত। চাকরি, পেশা ও সরকারি সুযোগ-সুবিধায় কোনো বৈষম্য থাকবে না। তিনি দেশ সংস্কারের লক্ষ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে গণভোট চেয়ে জনসভায় উপস্থিত সবাইকে পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে সমর্থন আদায়ের আহবান জানান।
নিহত রেজাউল করিমের কবর জিয়ারত : এর আগে সকালে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার চাওলিয়া গ্রামে গিয়ে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত উপজেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজার কবর জিয়ারত করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ‘রাজনীতির নামে যারা মানুষ খুন করে, রক্তপাত ঘটায়, আমরা সেই রাজনীতি চাই না, আমরা হত্যাকারীদের ঘৃণা করি। যারা নোংরা রাজনীতি করে, তারা ভীরু, কাপুরুষ।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘সবার হাতে হাতে ঘটনার ভিডিও আছে। গত বুধবার হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মামলাও হয়েছে। কিন্তু এত দিনেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। যারা হত্যার সঙ্গে জড়িত, আল্লাহ যেন তাদের হেদায়েত দান করেন, সেই প্রার্থনা করেন।’
তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা সবাই মিলে একটা সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।’ পরে আমিরে জামায়াত নিহত রেজাউলের স্ত্রী-সন্তান, বাবা-ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে কিছু উপহারসামগ্রী তুলে দেন। পরে তিনি হেলিকপ্টারযোগে শেরপুর শহরের শহীদ দারোগ আলী পৌরপার্ক মাঠের নির্বাচনী জনসভার উদ্দেশে যান।
উল্লেখ্য, গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুর-৩ আসনের ঝিনাইগাতীতে প্রশাসন আয়োজিত নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে রেজাউল করিম নিহত হন এবং উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এ ঘটনায় ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম রাসেল ও থানার ওসি মো. নাজমুল হাসানকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। ঘটনা তদন্তে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিহতের স্ত্রী মাজিয়া শনিবার রাতে ঝিনাইগাতী থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



