ছবি: সংগৃহীত
শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের এক ভয়াবহ ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে এই মামলা দায়ের করা হয়, যা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
রোববার গভীর রাতে রাজধানীর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে সাফিকুর রহমানের বাসা থেকে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। সোমবার তাদের ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রাজু আহমেদের আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রোমের মিয়া আদালতে আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত আসামিপক্ষের জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এই মামলায় গ্রেপ্তার চারজন হলেন— বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এমডি ও সিইও সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি, এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও মোছা. সুফিয়া বেগম।
আসামিদের পক্ষে জামিন চেয়ে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন। তিনি আদালতে বলেন, সাফিকুর রহমান একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং তিনি অধিকাংশ সময় সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকেন। তার দাবি, এসব ঘটনার সঙ্গে এমডির কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং বাসায় কী ঘটেছে, সে বিষয়েও তিনি অবগত ছিলেন না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভুক্তভোগী শিশুটিকে ‘অক্ষত অবস্থায়’ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া এমডির স্ত্রী বীথি একজন বয়স্ক ও অসুস্থ নারী— তিনিও এসব নির্যাতনের বিষয়ে কিছু জানতেন না বলে দাবি করা হয়।
তবে রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউশনের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য এসআই তাহমিনা আক্তার জামিনের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি আদালতে বলেন, জীবিকার তাগিদে দরিদ্র পরিবার ১১ বছরের শিশুটিকে কাজে পাঠিয়েছিল। কিন্তু ওই বাসায় যাওয়ার পর থেকেই শিশুটি নিয়মিত ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, “শিশুটির শারীরিক অবস্থা ভয়াবহ। নির্যাতনের চিহ্ন স্পষ্ট।”
ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা, যিনি পেশায় একজন হোটেল কর্মচারী, রোববার উত্তরা পশ্চিম থানায় এই মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত সাফিকুর রহমানের বাসায় শিশুটিকে গৃহকর্মী হিসেবে নেওয়া হয় গত বছরের জুন মাসে।
এজাহার অনুযায়ী, ওই বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর শিশু গৃহকর্মী খুঁজছিলেন। তার মাধ্যমে গোলাম মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। মেয়ের বিয়ে ও ভবিষ্যতের যাবতীয় খরচ বহনের আশ্বাস দেওয়া হলে গোলাম মোস্তফা রাজি হয়ে তার অল্প বয়সী মেয়েকে ওই বাসায় কাজে পাঠান।
গোলাম মোস্তফা সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর মেয়েকে ওই বাসায় গিয়ে দেখে আসেন। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় তাকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে আরও বলা হয়, চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি বীথি ফোন করে গোলাম মোস্তফাকে জানান, তার মেয়ে অসুস্থ এবং তাকে যেন দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয়। সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে গোলাম মোস্তফা উত্তরার ওই বাসায় গিয়ে মেয়েকে বুঝে নেন।
মেয়েকে কাছে পাওয়ার পরই তিনি তার দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম দেখতে পান। শিশুটি ঠিকভাবে কথা বলতে পারছিল না। মেয়ের শরীরের এমন অবস্থার কারণ জানতে চাইলে বীথি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে গোলাম মোস্তফা তার মেয়েকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি তার বাবাকে জানায়, ওই বাসায় তাকে নিয়মিত মারধর করা হতো। শুধু তাই নয়, খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করে শিশুটি।
উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিক আহমেদ জানান, ১১ বছরের এক শিশু গৃহকর্মীকে বীভৎসভাবে নির্যাতনের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। সেই মামলার ভিত্তিতে রোববার রাত সাড়ে ৩টার দিকে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, শিশুটির চিকিৎসা চলছে এবং তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মামলার তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই ঘটনায় শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন মহল। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই ঘটনা সমাজে শিশু গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



