ছবি: সংগৃহীত
রাজস্ব খাতের গুরুত্বপূর্ণ দুই বিভাগের শীর্ষ পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও পদ্ধতি নির্ধারণকে কেন্দ্র করে সরকারি প্রশাসনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কাঠামো পুনর্গঠনের নামে সাম্প্রতিক সময়ে গৃহীত কিছু সিদ্ধান্তকে প্রশাসনের একাংশ সংবিধান ও ‘রুলস অব বিজনেস’-এর পরিপন্থী বলে মনে করছেন। বিশেষ করে নির্বাচনের প্রাক্কালে অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ সংশোধন করা হয়। উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের পর বিষয়টি গত ২০ জানুয়ারি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় পাস হয়। তবে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির অনুমোদন ছাড়াই অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন নেওয়া হয়েছে—যা নিয়ে প্রশাসনে প্রশ্ন উঠেছে।
এ খবর প্রকাশের পরপরই প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিএএসএ)-এর নেতৃত্বে শতাধিক প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তা অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, স্থানীয় সরকার ও পূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. শেখ আবদুর রশীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, সংশোধিত অধ্যাদেশ কার্যবিধিমালা লঙ্ঘন করেছে এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
বিএএসএ নেতারা বৈঠকে বলেন, দেশে কয়েক দিনের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এমন সময় অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে এমন সিদ্ধান্ত নিলে মাঠ প্রশাসনে বিভ্রান্তি ও নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। তাঁদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই যুক্তিসংগত হতো।
এর আগে গত ৩০ জানুয়ারি আল জাজিরা টেলিভিশনের অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেন। তিনি লেখেন, রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আলাদা করার উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ গঠন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব আহরণে গতি আনা ও দক্ষতা বাড়ানো। তবে তাঁর মতে, অধ্যাদেশটির একাধিক ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং ‘কার্যবিধিমালা, ১৯৯৬’-এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
জুলকারনাইন সায়ের আরও উল্লেখ করেন, অধ্যাদেশটির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য শীর্ষ পদ কার্যত সংরক্ষিত করে দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তিনি বলেন, সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রণালয় বা বিভাগ সৃষ্টি করার এখতিয়ার নির্বাহী বিভাগের। অথচ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিভাগ সৃষ্টি করে ক্ষমতার পৃথককরণ নীতির ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যমান রাজস্ব কাঠামো পুনর্গঠন করে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং গত ১ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ওই অধ্যাদেশে দুই বিভাগের সচিব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হয়েছে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তা নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই ধরনের শর্ত রাজস্ব নীতি বিভাগের ক্ষেত্রেও যুক্ত করা হয়েছে, যাতে ওই ক্যাডারের কর্মকর্তারাই সচিব পদে নিয়োগ পান।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দুই বিভাগের শীর্ষ পদে নিয়োগের জন্য সামষ্টিক অর্থনীতি, বাণিজ্য নীতি, পরিকল্পনা, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। নিকার বৈঠকে প্রস্তাব অনুমোদনের পর গত ২৯ জানুয়ারি প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির অনুমোদন ছাড়াই প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন নেওয়া হয়। অথচ ওই দিনই ১ ফেব্রুয়ারি সচিব কমিটির বৈঠক আহ্বান করা হয়েছিল এবং বৈঠকটি অনুষ্ঠিতও হয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
প্রশাসনের একাংশের মতে, ‘কার্যবিধিমালা, ১৯৯৬’-এর ৩(১) বিধি অনুযায়ী মন্ত্রণালয় বা বিভাগ সৃজনের এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন নির্বাহী বিভাগের। অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিভাগ সৃষ্টি করে সেই ক্ষমতা কার্যত আইন বিভাগের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁদের দাবি, অধ্যাদেশ বা আইনের মাধ্যমে বিভাগ সৃজনের কোনো বিধান কার্যবিধিমালায় নেই।
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়া করে অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেই তাঁদের ধারণা। তাঁদের মতে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো না।
কয়েকজন কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিপুল অঙ্কের কর মাফের বিষয় জড়িত থাকতে পারে—এমন আলোচনা প্রশাসনের ভেতরে চলছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
বিএএসএর একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সংবিধান ও রুলস অব বিজনেস লঙ্ঘনের বিষয়টি তাঁরা কয়েক দিন আগেই আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে অবহিত করেছেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত মাঠ প্রশাসনে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে এবং আসন্ন নির্বাচনের পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একই উদ্বেগ তাঁরা রবিবার অর্থ উপদেষ্টা, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদসচিবের কাছেও তুলে ধরেছেন।
বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন বলে বিএএসএ নেতাদের দাবি। তবে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, অধ্যাদেশে প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা তাঁর হাতেই রয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে অনিশ্চয়তা ও অস্বস্তি এখনো কাটেনি।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



