ছবি: সংগৃহীত
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণের শোক কাটিয়ে দেশের রাজনীতিতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত এখন একটাই লক্ষ্য—আসন্ন জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, দলীয় দমন-পীড়ন ও সাংগঠনিক বিপর্যয়ের পর এই নির্বাচনকে বিএনপি দেখছে রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ বড় সুযোগ হিসেবে। ফলে শোকের আবহ কাটতেই দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমে পড়েছেন নির্বাচনী প্রস্তুতি, সংগঠন পুনর্গঠন ও ভোটার সংযোগ বাড়ানোর কাজে।
দলীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপির রাজনীতিতে আবেগের পাশাপাশি নতুন এক বাস্তবতাও তৈরি করেছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা এখন নির্বাচনী লড়াইয়ে রূপ নিতে শুরু করেছে। অনেক জায়গায় বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, “এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, এটা ম্যাডামের প্রতি শেষ সম্মানের লড়াই।” এই আবেগকে পুঁজি করেই দলটি জনসভা, কর্মিসভা ও ঘরোয়া বৈঠকের মাধ্যমে ভোটের মাঠ চাঙা করতে চাইছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে লন্ডন থেকে দলের কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো ঝালিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দলীয় কোন্দল, নেতৃত্ব সংকট বা বিভক্তি রয়েছে, সেখানে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অনেক জায়গায় পুরোনো নেতাদের ফের সক্রিয় করা হচ্ছে, আবার তরুণ ও পেশাজীবী মুখগুলোকে সামনে আনার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।
বিএনপির কৌশলগত লক্ষ্য এখন দ্বিমুখী। একদিকে নিজেদের শক্তিশালী প্রার্থী দিয়ে প্রতিটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা, অন্যদিকে বিরোধী জোটগুলোর সঙ্গে ন্যূনতম সমন্বয় রেখে ভোট বিভাজন কমানো। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ভোটের মাঠে যদি বিরোধী শক্তি একেবারে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ক্ষমতাসীনদের জন্য সুবিধা তৈরি হবে। তাই আনুষ্ঠানিক জোট না হলেও কৌশলগত সমঝোতার পথ খোলা রাখছে বিএনপি।
অন্যদিকে, মাঠে সক্রিয় রয়েছে ১১ দলীয় জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। দলটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকলেও এবারের নির্বাচনকে তারা নিজেদের পুনরুত্থানের সুযোগ হিসেবে দেখছে। মাঠপর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। ধর্মীয় ও নৈতিক রাজনীতির স্লোগান তুলে তারা নির্দিষ্ট ভোটব্যাংককে আরও সংহত করার চেষ্টা করছে।
তবে জামায়াত জোটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখনো আসন সমঝোতা। জোটের ভেতর কোন দল কোন আসনে লড়বে, কাকে ছাড় দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে অনেক জায়গায় একাধিক দল একই আসনে প্রার্থী দিতে চাইছে, যা ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা তৈরি করছে। জোটের একাধিক নেতার মতে, যদি দ্রুত সমঝোতা না হয়, তাহলে মাঠে নামার আগেই তারা নিজেদের শক্তি ক্ষয় করে ফেলবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও জামায়াত জোট উভয়ই একধরনের সময়ের সঙ্গে দৌড়াচ্ছে। বিএনপির সামনে রয়েছে আবেগকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ, আর জামায়াত জোটের সামনে রয়েছে নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার প্রশ্ন। দু’পক্ষই জানে, আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি ভোটের দিন নয়, বরং আগামী বহু বছরের রাজনৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে।
এদিকে ক্ষমতাসীন পক্ষও নীরবে বসে নেই। তাদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি, প্রার্থী বাছাই ও মাঠপর্যায়ের কাজকর্মও ধীরে ধীরে গতি পাচ্ছে। ফলে নির্বাচনের মাঠে একটি ত্রিমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে—বিএনপির আবেগী জোয়ার, জামায়াত জোটের সংগঠিত ভোটব্যাংক এবং ক্ষমতাসীনদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব।
সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতি এখন প্রবল অনিশ্চয়তা ও সমীকরণের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। কোন জোট কতটা ঐক্যবদ্ধ থাকবে, কোথায় কে ছাড় দেবে, আর ভোটের দিন সাধারণ মানুষ কোন দিক বেছে নেবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোকের আবহ কাটিয়ে বিএনপি যে নতুন উদ্যমে ভোটযুদ্ধে নামছে, তাতে এবারের নির্বাচন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ হতে যাচ্ছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



