ছবি: সংগৃহীত
চলতি শিক্ষাবর্ষে স্কুলে ভর্তি যেন অভিভাবকদের জন্য এক রকমের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত নীতিমালাকে উপেক্ষা করে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশের বহু সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে ভর্তি ফি ও অন্যান্য চার্জ আদায়ের লাগামহীন উৎসব। সরকার নির্ধারিত সীমার কয়েক গুণ বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে, ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর ভয়াবহ আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
নীতিমালা কাগজে, বাস্তবে ভিন্ন চিত্র
চলতি বছরের ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ভর্তি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। আংশিক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে এই সীমা আট হাজার এবং ইংরেজি ভার্সনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবে এসব সীমা যেন শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ।
অভিভাবকরা অভিযোগ করছেন, স্কুলগুলো ভর্তি ফি ছাড়াও ‘উন্নয়ন ফি’, ‘সেশন চার্জ’, ‘ফরম ফি’, এমনকি কোথাও কোথাও মার্চ মাস পর্যন্ত অগ্রিম বেতন আদায় করে ভর্তি দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ‘পুনঃভর্তি ফি’ও নতুন নামে আদায় করা হচ্ছে। ফলে একটি শিশুকে স্কুলে ভর্তি করাতেই কোথাও কোথাও ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
সারাদেশেই একই অবস্থা
নীতিমালায় বলা আছে—
-
মফস্বল এলাকায় সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা
-
পৌর উপজেলা এলাকায় এক হাজার টাকা
-
জেলা সদরে দুই হাজার টাকা
-
ঢাকা ছাড়া অন্যান্য মহানগরে তিন হাজার টাকার বেশি নেওয়া যাবে না
কিন্তু বাস্তবে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি স্কুল এই নীতিমালা মানেনি। বেশির ভাগ স্কুলে ভর্তি কার্যক্রম শেষ হলেও তারা নীতিমালা উপেক্ষা করেই অতিরিক্ত টাকা আদায় করেছে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, “ভর্তি ফি নিয়ে যা হচ্ছে তা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট। অভিভাবকরা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন, অথচ সরকার কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।”
রাজধানীর নামকরা স্কুলে হাজার হাজার টাকা
রাজধানীর পুরানা পল্টনের লিটল জুয়েলস স্কুলে নার্সারিতে ভর্তি হতে নেওয়া হচ্ছে ৪০ হাজার টাকা, যেখানে নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার কথা। অর্থাৎ ৩০ হাজার টাকা বেশি আদায় করা হচ্ছে।
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ইংরেজি ভার্সনে ভর্তি হতে এক অভিভাবককে দিতে হয়েছে ১০ হাজার টাকা এবং প্রথম শ্রেণিতে ১১ হাজার টাকা। নীতিমালা অনুযায়ী এটি এক হাজার টাকা বেশি।
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে বাংলা মাধ্যমে ভর্তি ফি ১০ হাজার এবং ইংরেজি মাধ্যমে ১২ হাজার টাকা। এর বাইরে বই-খাতা বাবদ আরও ৩,২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলা মাধ্যমে ভর্তি ফি আট হাজার টাকা এবং ইংরেজি ভার্সনে ১০ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানটিতে ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। অভিভাবকদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ভর্তি ফি থেকেই প্রতিষ্ঠানটির এ বছর ন্যূনতম আয় ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
একজন অভিভাবক বলেন, “আইডিয়াল স্কুল একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান। তারা চাইলে ভর্তি ফি অনেক কম রাখতে পারত। কিন্তু তারা করছে ঠিক উল্টোটা।”
সরকারি স্কুলেও টাকা আদায়ের অভিযোগ
শুধু বেসরকারি নয়, সরকারি স্কুলেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মোহাম্মদপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি ও বিনামূল্যের বই বিতরণের সময় শিক্ষার্থীপ্রতি ৫০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা।
মোহাম্মদপুর থানা শিক্ষা কর্মকর্তা নাইয়ার সুলতানা বলেন, “যদি টাকা নেওয়া হয়ে থাকে, সেটি সম্পূর্ণ অনৈতিক। লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।”
টিউশন ফিতেও সীমা ভাঙছে স্কুলগুলো
শুধু ভর্তি ফি নয়, টিউশন ফিতেও চলছে সীমালঙ্ঘন। সরকার নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী ঢাকায় বেসরকারি স্কুলে মাসিক বেতন সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা এবং কলেজে এক হাজার ১০০ টাকা। কিন্তু মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে স্কুল শাখায় আদায় করা হচ্ছে এক হাজার ৪৫০ টাকা এবং কলেজে দুই হাজার ২০০ টাকা।
২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর জারি করা নতুন নীতিমালায় টিউশন ফি ছাড়াও ২৩ ধরনের অতিরিক্ত ফি নির্ধারণ করা হয়েছে—যার প্রতিটি সর্বোচ্চ ২০০ টাকার মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরীক্ষা, ক্রীড়া, লাইব্রেরি, আইসিটি, স্কাউট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিকিৎসাসেবা, উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও শিক্ষা সফরের মতো খাত। কিন্তু বাস্তবে অনেক স্কুল এসব খাতকে অজুহাত বানিয়ে হাজার হাজার টাকা নিচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণ নেই, নজরদারিও দুর্বল
প্রতি বছর ভর্তি মৌসুম এলেই একই অভিযোগ ওঠে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কার্যকর নজরদারি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে স্কুলগুলো কার্যত নিশ্চিত জেনেই চলছে যে অতিরিক্ত টাকা নিলেও তাদের কিছু হবে না।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই নৈরাজ্য শুধু অভিভাবকদের নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আঘাত হানছে। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মানসম্মত স্কুলে পড়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
ভর্তি ফি ও টিউশন ফি নিয়ে এই অব্যবস্থাপনা যদি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তবে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে—এমন আশঙ্কাই এখন অভিভাবক সমাজের।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



