ছবি: সংগৃহীত
সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর গত তিন দিনে অন্তত ৩৫টি আসন থেকে অনিয়মের লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। ইমেইলেও কিছু আবেদন এসেছে। সব মিলিয়ে নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থাটির দপ্তরে লিপিবদ্ধ হয়েছে অর্ধশতাধিক অভিযোগ ।
তবে ইসি বলছে, নির্বাচনের ফল গেজেট প্রকাশের পর এ বিষয়ে ইসির কিছু করার নেই। আইন অনুযায়ী, সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের এখন নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে হবে। প্রতিকার না পেলে উচ্চ আদালতেও যেতে পারেন তারা।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গতকাল রোববার সাংবাদিকদের বলেছেন, আইনের দ্বারস্থ হতে কোনো বাধা নেই। আইন তাদের এই সুযোগ দিয়েছে, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিয়ে হাইকোর্টের কাছে গেলে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত পাবে। আদালতের নির্দেশ পেলে ভোট পুনর্গণনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ইসি।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন গতকাল রাতে বলেন, ভোটের ফল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তাদের কাছে আসছে। সেগুলো নথিভুক্ত করে কমিশনে পাঠানো হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত ঠিক কতগুলো অভিযোগ জমা পড়েছে– সে বিষয়ে হিসাব করা হয়নি। তিনি জানান, নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আগেই নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। যেটা গেজেট প্রকাশের সঙ্গেও বলা হয়েছে। সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের সেখানেই আপিল করতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ শেষে শুক্রবার দুপুরে ২৯৭ আসনের সংসদ নির্বাচন ছাড়াও গণভোটের বেসরকারি ফল ঘোষণা করে ইসি। একই দিন গভীর রাতে জয়ী প্রার্থীর গেজেট প্রকাশ করে তারা।
তবে গেজেট প্রকাশের আগেই কয়েকজন প্রার্থী অনিয়মের অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট আসনের গেজেট প্রকাশ স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই আবেদন আমলে না নিয়ে ইসি গেজেট প্রকাশ করেছে বলে দাবি জোট নেতাদের।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন আসনের পরাজিত প্রার্থীরা ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ এনে ইসিতে লিখিত আবেদন দিচ্ছেন। গতকাল ১১ দলীয় ঐক্যের একটি প্রতিনিধি দল ইসিতে লিখিত অভিযোগ করেন, অনিয়ম ও জালিয়াতি করে ৩২টি আসনে অল্প ব্যবধানে তাদের প্রার্থীদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ৩২ আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানানোর পাশাপাশি এ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে জোটটি।
এর আগে শনিবার ঢাকা-১৩ আসনের প্রার্থী মামুনুল হক আলাদাভাবে লিখিত অভিযোগ দেন ইসিতে। গতকাল ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও আলাদাভাবে অভিযোগ দেন। এ ছাড়া গত তিন দিনে বিএনপির একজনসহ আরও বেশ কয়েকটি আসনের পরাজিত প্রার্থী লিখিত বা ইমেইলে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন।
এদিকে শেরপুর-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা তাঁর আসনে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং ও ব্যাপক অনিয়মের দাবি করে ইসিতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ফল স্থগিত এবং ফের ভোট গ্রহণের দাবিও জানান তিনি।
ইসিতে আবেদনকারী এসব প্রার্থীর ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে তেমন কোনো আপত্তি নেই। তবে প্রায় সবাই ভোট গণনা ও ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ এনেছেন। এ ক্ষেত্রে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে তাদের হারানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন প্রার্থীরা।
অনেক প্রার্থীর অভিযোগ, ভোট গণনার সময় তাদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে বা অগ্রিম সই নেওয়া হয়েছে। ফলাফল শিটে প্রকৃত এজেন্টদের সই না নিয়ে জাল স্বাক্ষর দেওয়া হয়েছে। ফল শিটে পেন্সিল দিয়ে লেখা, ঘষামাজা ও ওভাররাইটিং করে ফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেকেই। বেজোড় সংখ্যক প্রার্থীর আসনের ক্ষেত্রে ব্যালট পেপারে কোনো কোনো প্রার্থীর নাম ও প্রতীকের পাশে ফাঁকা রেখে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভোটাররা ফাঁকা জায়গায় সিল মারার পরে সূক্ষ্ম কৌশলে সেসব ব্যালট বাতিল করা হয়। এ ছাড়া ভোট গণনকালে প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও এনেছেন কেউ কেউ।
গতকাল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রতিনিধি দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ জানান, ফল কারচুপি ও ম্যানুপুলেশন করে কমপক্ষে ৩২ আসনে অল্প ভোটের ব্যবধানে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থীকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। কমিশনে দেওয়া লিখিত অভিযোগে এসব আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানানো হয়েছে। কয়েকটি আসনের কিছু কেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও সিল মারার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি বারবার কমিশনকে জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
আসনগুলো হচ্ছে পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-৩, দিনাজপুর-৫, লালমনিরহাট-১, লালমনিরহাট-২, গাইবান্ধা-৪, বগুড়া-৩, সিরাজগঞ্জ-১, যশোর-৩, খুলনা-৩, খুলনা-৫, বরগুনা-১, বরগুনা-২, ঝালকাঠি-১, পিরোজপুর-২, ময়মনসিংহ-১, ময়মনসিংহ-৪, ময়মনসিংহ-১০, কিশোরগঞ্জ-৩, ঢাকা-৭, ঢাকা-৮, ঢাকা-১০, ঢাকা-১৩, ঢাকা-১৭, গোপালগঞ্জ-২, ব্রাক্ষণবাড়িয়া-৫, চাঁদপুর-৪, চট্টগ্রাম-১৪ ও কক্সবাজার-৪।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



