ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিদেশি নাগরিকদের আগমন–প্রস্থান ও অবস্থানের ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করছে সরকার। বিশেষ করে অন-অ্যারাইভাল ভিসা (আগমনী ভিসা) ব্যবস্থায় বড় ধরনের কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিদেশি নাগরিকরা কেন বাংলাদেশে আসছেন, কে তাদের স্পন্সর করছে, কোথায় থাকবেন এবং কখন ফিরবেন—সবকিছু এখন থেকে কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে সম্প্রতি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছে পৌঁছেছে। দায়িত্বশীল সূত্র ও নথিপত্রের বরাতে জানা গেছে, নির্বাচনকালীন সময়ে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি বা অনাকাঙ্ক্ষিত তৎপরতা ঠেকাতেই এই কঠোরতা।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২০ জানুয়ারি থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই বিশেষ নজরদারি কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও নৌবন্দরে দায়িত্বরত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে বিদেশি নাগরিকদের আগমন, অবস্থান ও প্রস্থানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ভিসা নীতিমালা ২০০৬’ এবং পরবর্তীকালে জারি হওয়া সব প্রজ্ঞাপন যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। এর অর্থ হলো, আগমনী ভিসাসহ সব ধরনের ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে আগে যেসব শর্ত ও যাচাই প্রক্রিয়া ছিল, এখন সেগুলো আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে।
বিশেষ করে অন-অ্যারাইভাল ভিসার ক্ষেত্রে আগত বিদেশি নাগরিকের উদ্দেশ্য, তাকে কে বা কোন প্রতিষ্ঠান আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তিনি কোথায় থাকবেন এবং তার কাছে ফিরতি টিকিট আছে কি না—এসব বিষয় খুঁটিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সব তথ্য যাচাই করে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে হবে। কোনো ধরনের সন্দেহ, অসংগতি বা অনিয়ম দেখা গেলে ভিসা দেওয়া যাবে না।
এ ছাড়া বিদেশি সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো বিদেশি সামরিক বা নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য বাংলাদেশে আসতে চাইলে আগেভাগেই মন্ত্রণালয়ের লিখিত অনুমোদন নিতে হবে।
তবে সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও গণমাধ্যমের কাজে আসা বৈধ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে যারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে আসবেন, তাদের ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণ’ উল্লেখসহ আগমনী ভিসা দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সুপারিশ থাকলে ভিসা ফিও মওকুফ করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাই বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করুন। তবে একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাও যেন বিঘ্নিত না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভিসা ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট সময়সীমা ও শর্ত ঠিক করা হয়েছে।”
সরকারের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব স্থল ও নৌ-বন্দরে স্পেশাল ব্রাঞ্চ, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন বা দূতাবাস, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, এসবি এবং বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রতিদিন বিদেশি নাগরিকদের ভিসা, আগমন ও প্রস্থানের বিস্তারিত তথ্য এক্সেল ফরম্যাটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের (বহিরাগমন অনুবিভাগ) কাছে ই-মেইলে পাঠাতে বলা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, নির্বাচন ও গণভোটের মতো সংবেদনশীল সময়ে বিদেশি নাগরিকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। “এই সময় কূটনীতিক, পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের পাশাপাশি নানা সংস্থার লোকজনও আসে। কিন্তু এই সুযোগে কেউ যদি অপতৎপরতা চালাতে চায়, সেটি ঠেকাতে ভিসা যাচাইয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা দরকার,” বলেন তিনি।
সাবেক আইজিপি ও কূটনীতিক নূর মোহাম্মদও মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত নিরাপত্তার দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, “নির্বাচনের মতো সময়ে বিদেশি নাগরিকদের আগমন, অবস্থান ও প্রস্থানের তথ্য যদি সমন্বিতভাবে নজরদারিতে না থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। উদ্দেশ্য, স্পন্সর, আবাসস্থল ও ফিরতি টিকিট যাচাইয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ ঠেকানো সম্ভব।”
আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, ভিসা নীতিমালা অনুযায়ী রাষ্ট্রের কাছে ভিসা প্রদান, প্রত্যাখ্যান বা বাতিল করার পূর্ণ আইনগত ক্ষমতা রয়েছে। “জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে আগমনী ভিসাসহ যেকোনো ভিসা প্রত্যাখ্যান করা আইনসম্মত। তবে সিদ্ধান্তের পেছনে লিখিত রেকর্ড থাকা জরুরি, যাতে প্রয়োজনে তার যৌক্তিকতা প্রমাণ করা যায়,” বলেন তিনি।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে অন-অ্যারাইভাল ভিসাসহ সব ধরনের ভিসা ব্যবস্থায় সরকারের এই কঠোরতা একদিকে যেমন জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করবে, তেমনি অন্যদিকে বৈধ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের উপস্থিতির মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও বজায় রাখার চেষ্টা করবে। নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



