ছবি: সংগৃহীত
ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার আগেই পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা ঘিরে বড় ধরনের বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও ও অভিযোগের পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী ভোটারদের জন্য চালু হওয়া এই নতুন ব্যবস্থা নিয়ে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, একটি বাসায় কয়েকজন ব্যক্তি বিপুলসংখ্যক পোস্টাল ব্যালট পেপার গুনছেন। এসব ব্যালটের খামে বাহরাইনের ঠিকানা লেখা ছিল। বিএনপিসহ কয়েকটি দল অভিযোগ করেছে, এটি ব্যালটের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে গুরুতর শঙ্কা তৈরি করেছে। তারা নির্বাচন কমিশনে (ইসি) গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্বেগ জানিয়েছেন এবং বিষয়টির তদন্ত দাবি করেছেন।
এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে ‘আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট’ চালু করেছে নির্বাচন কমিশন। আগে দেশের ভেতরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কারাবন্দিদের জন্য সীমিত আকারে এই ব্যবস্থা ছিল। এবার আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রবাসী ভোটারদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ জন্য ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নামে একটি অ্যাপ চালু করা হয়, যার মাধ্যমে গত ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত নিবন্ধন গ্রহণ করা হয়।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে মোট ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১৫৫ জন ভোটার পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার প্রায় সাত লাখ ৬৭ হাজার। বাকি ভোটাররা দেশের ভেতরের সরকারি কর্মচারী, নির্বাচন কর্মকর্তা, আনসার-ভিডিপি সদস্য ও কারাবন্দি। নিবন্ধিতদের মধ্যে প্রায় পৌনে ছয় লাখ সরকারি চাকরিজীবী, প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার নির্বাচনী কর্মকর্তা, ১০ হাজার আনসার-ভিডিপি সদস্য এবং ছয় হাজারের কিছু বেশি কারাবন্দি রয়েছেন।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিবন্ধিত ভোটারদের কাছে ধাপে ধাপে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হচ্ছে। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থী ও প্রতীকের তথ্য ভোটারদের অ্যাপে জানানো হবে। এরপর তারা ব্যালটে ভোট দিয়ে তা ফেরত পাঠাতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও সার্বিকভাবে পোস্টাল ভোট মোট ভোটারের প্রায় ১ শতাংশের মতো, তবে কিছু আসনে এর প্রভাব অনেক বড় হতে পারে। অন্তত ১৮টি আসনে ১০ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে ফেনী-৩ আসনে সর্বোচ্চ ১৬ হাজারের বেশি ভোটার রয়েছেন। চট্টগ্রাম-১৫, কুমিল্লা-১০, নোয়াখালী-১, নোয়াখালী-৩ ও ফেনী-২ আসনেও সাড়ে ১২ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধিত। এসব আসনে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হলে পোস্টাল ভোটই ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে ৩০টির বেশি আসনে ১০ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারও কিছু আসনে পোস্টাল ভোট নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে বিএনপি অভিযোগ করেছে, বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে প্রতীক বিন্যাসে ‘কৌশলগত পক্ষপাত’ রয়েছে। তাদের দাবি, কিছু নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক এমনভাবে প্রথম সারিতে রাখা হয়েছে যে তা ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ব্যালটের বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে যে বিএনপির প্রতীক ভাঁজ করলে ঠিকমতো চোখে পড়ে না। তাদের মতে, কলাম ও সারির সংখ্যা সামান্য বদলালেই এই সমস্যা এড়ানো যেত, যা না করায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, প্রতীক বিন্যাস পুরোপুরি নিয়ম মেনে ও আলফাবেটিক্যাল পদ্ধতিতে করা হয়েছে। প্রকল্প টিম লিডার সালীম আহমাদ খান বলেন, ১১৯টি প্রতীককে নির্ধারিত দুই পাতায় বসাতে গিয়ে যে জায়গায় প্রয়োজন, সেভাবেই দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো পক্ষপাতের সুযোগ নেই। ভোটার নিজেই নিজের পছন্দের প্রতীক খুঁজে সিল দেবেন, তাই প্রতীক কোথায় আছে তা ফলাফলে প্রভাব ফেলার কথা নয়।
বাহরাইনে ব্যালট বিতরণে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে ইসি জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। দূতাবাস জানিয়েছে, কয়েকজন প্রবাসী ডাককর্মীদের কাছ থেকে একসঙ্গে ব্যালট নিয়ে নিজেরা বিতরণ করতে চেয়েছিলেন। পরে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে দূতাবাস হস্তক্ষেপ করে সব ব্যালট নিজেদের কাছে নিয়ে নিয়েছে এবং সেগুলো ঠিকানাভিত্তিক বিতরণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পোস্টাল ব্যালটে ভোটের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়মতো ব্যালট ফেরত আসা। আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় ২৪ শতাংশ পোস্টাল ব্যালট গন্তব্যে পৌঁছায় না। ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে যে ব্যালটগুলো পৌঁছাবে না, সেগুলো গণনায় আসবে না। এ ছাড়া আগে হাতে পেয়ে কেউ ভোট প্রকাশ করে দিলে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকিও রয়েছে। ইসি জানিয়েছে, কেউ গোপনীয়তা ভঙ্গ করলে তার এনআইডি ব্লক করা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা একদিকে প্রবাসী ও বিশেষ শ্রেণির ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার সুযোগ এনে দিয়েছে, অন্যদিকে এর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নানা প্রশ্নও তুলেছে। কোন কোন আসনে এই ভোট ফল নির্ধারণে কী ভূমিকা রাখে, তা এখন পুরোপুরি নির্ভর করবে ব্যালট বিতরণ, ফেরত আসা এবং গণনার প্রক্রিয়া কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্পন্ন হয় তার ওপর।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



