ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। ইরানের ওপর অতিসত্বর নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। রোববার (২৫ অক্টোবর) যেকোনো মুহূর্তে তেহরানের কৌশলগত ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে মার্কিন বাহিনী—এমনটাই পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সঙ্গে তিনি এক রহস্যময় কূটনীতিরও আভাস দিয়েছেন; যেখানে একদিকে রয়েছে একটি সম্ভাব্য বড় ধরনের শান্তিচুক্তি, আর অন্যদিকে ইরান পরিস্থিতি একেবারে 'চিরতরে শেষ' করে দেওয়ার চূড়ান্ত সামরিক পদক্ষেপ। ট্রাম্পের এই অনমনীয় ও আক্রমণাত্মক অবস্থানের ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রথম এই সামরিক অভিযানের ইঙ্গিতটি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে হয়তো আবারও একটি ‘ছোটখাটো এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হতে পারে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের প্রধান মিত্র ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘এপিক ফিউরি’। ট্রাম্পের নতুন এই হুমকির পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, পূর্বের যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ওয়াশিংটন এবার আরও বড় ও মারাত্মক হামলার ছক কষছে। মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে ধারণা করা হচ্ছে, চলতি সপ্তাহান্তেই (সপ্তাহের শেষ দিকে) ইরানে এই অভিযানের নতুন পর্ব বাস্তবায়িত হতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর পর দুটি হুমকির জবাবে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম 'প্রেস টিভি'-তে প্রচারিত এক বিশেষ রাজনৈতিক ভাষণে তিনি সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বিপর্যয় ও অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই পুরোপুরি দায়ী করেন।
ভাষণে পেজেশকিয়ান মার্কিন প্রশাসনের নীতি ও কর্মকর্তাদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, "মার্কিন কর্মকর্তাদের চরম 'কাপুরুষোচিত' এবং অস্থিতিশীল আচরণের কারণেই পুরো কূটনৈতিক আলোচনা ভেস্তে গেছে। তাদের ভুল সিদ্ধান্ত ও একগুয়েমির ফলেই আজ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এই বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।"
তবে কড়া ভাষায় সমালোচনা করলেও, আলোচনার দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে চাননি ইরানি প্রেসিডেন্ট। তিনি যোগ করেন, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কারোর জন্যই সুফল বয়ে আনবে না। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই উভয় পক্ষের উচিত মূল চুক্তির টেবিলে ফিরে আসা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতাটি অবিলম্বে চূড়ান্ত করা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকির মুখে হাত গুটিয়ে বসে নেই ইরানের এলিট সামরিক বাহিনী 'ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস' (আইআরজিসি)। ইরানের আধা-সরকারি সংস্থা 'ফার্স নিউজ এজেন্সি'-র এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মার্কিন আক্রমণের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে আইআরজিসি।
গার্ড কর্পসের একজন জ্যেষ্ঠ মুখপাত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ওয়াশিংটন যদি মনে করে তারা ইরানের ভূখণ্ডে একটি ‘সীমিত বা ছোট আকারের’ হামলা চালিয়ে পার পেয়ে যাবে, তবে তা হবে তাদের ঐতিহাসিক ভুল। যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের হামলা চালালে ইরান আর চুপ থাকবে না। বরং সামান্য আক্রমণের জবাব দেওয়া হবে তারচেয়ে কয়েক গুণ বেশি শক্তি ও বিধ্বংসী ক্ষমতা দিয়ে। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলো তখন ইরানের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের রোববার হামলার ইঙ্গিত, অন্যদিকে ইরানি প্রেসিডেন্টের পাল্টা অভিযোগ এবং আইআরজিসির রক্তক্ষয়ী মহড়ার হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন-তেহরান সংঘাত এখন বিস্ফোরণের মুখে দাঁড়িয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আজ রোববারের দিনটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতি (বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার)-র জন্য অত্যন্ত সংকটময় একটি দিন হতে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বিশ্ব শক্তিগুলো কি পারমাণবিক কূটনীতির টেবিলে শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়, নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় আরও একটি বিধ্বংসী ও দীর্ঘস্থায়ী সর্বাত্মক যুদ্ধ।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



