ছবি: সংগৃহীত
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চরম চাপ, মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি এবং বর্তমান সরকারের বিতর্কিত বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ। রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানান। পূর্বঘোষিত এই বিক্ষোভ ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষ থেকে নজিরবিহীন কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল পুরো দেশ। তা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি শহরে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতা ও মুখোশধারী তরুণদের সংঘর্ষ এবং ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গত সপ্তাহের বিক্ষোভ চলাকালীন বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতা, দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে এবার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেয় ফরাসি কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভ মোকাবেলায় গত শুক্রবার থেকেই দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য এবং বিশেষায়িত নিরাপত্তা বাহিনীর ইউনিটগুলোকে মাঠে নামানো হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানান, গত ১৭ অক্টোবরের তুলনায় এবারের বিক্ষোভে অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সুপ্ত তৎপরতার কারণে সহিংসতার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে—এমন আশঙ্কাজনক গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতেই পুলিশকে যেকোনো পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কড়া নিরাপত্তা ও নানা নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দলে দলে সাধারণ মানুষ রাজধানীর প্যারিসের বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হতে শুরু করে। পুলিশের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, কেবল রাজধানী প্যারিসেই প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়ে রাজপথে দীর্ঘ মিছিল বের করে।
হাতে ফরাসি জাতীয় পতাকা ও প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড নিয়ে সমবেত হওয়া এসব বিক্ষুব্ধ মানুষের কণ্ঠে ছিল তীব্র সরকারবিরোধী ক্ষোভ। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের একাংশকে অত্যন্ত জোড়ালো ভাষায় স্লোগান দিতে শোনা যায়—‘রাষ্ট্র, পুলিশ এবং ফ্যাসিস্টদের পতন হোক’। প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় শনিবার সকাল থেকেই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে স্বাভাবিক জনজীবন একরকম থমকে যায়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, পুরো নগরীটি যেন এক প্রকার লকডাউনের কবলে পড়েছিল। নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ কুখ্যাত ২০টিরও বেশি মেট্রো স্টেশন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখে। পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত লুভর জাদুঘর, মুসে দর্সে এবং ঐতিহাসিক প্যারিস অপেরাসহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও পর্যটন কেন্দ্র দিনভর বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।
রাজধানীর প্যারিসের মূল বড় সমাবেশটি তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও দেশটির অন্যান্য বড় শহরগুলোতে পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
-
লিওঁ ও মার্সেই: এই শহরগুলোতে মুখোশধারী একদল তরুণ পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের সরাসরি সংঘর্ষ বাধে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার দায়ে পুলিশ লিওঁতে মুহুরমূহু কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।
-
নিস শহর: নিসের রাজপথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে জলকামান ব্যবহার করতে হয়।
-
ব্যাপক আটক: বিভিন্ন নগরীতে চলা এসব সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় পুলিশ অন্তত ১৩৫ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে। এছাড়া প্যারিসসহ মন্টপেলিয়ার, রুয়া ও নিসের মতো বড় শহরগুলোর কেন্দ্রস্থলে সভা-সমাবেশ ও যেকোনো ধরনের মিছিলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
আগের সপ্তাহের বিক্ষোভে দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত ও নির্মম লুটপাটের শিকার হয়েছিল। সেই ভয়ে এবার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও চরম উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয় এবং নগরীর অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে বন্ধ রাখা হয়।
এদিকে, ওর্লেয়াঁ শহরে ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির (আরএন) বার্ষিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করেও তীব্র রাজনৈতিক উত্তাপ ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেখানে প্রায় ১১ হাজার মানুষ একত্রিত হয়ে প্রতিবাদে অংশ নেয়।
প্যারিসে বিক্ষোভের মিছিলের নির্ধারিত রুট বা পথ পরিবর্তন নিয়েও পুলিশ ও আয়োজকদের মধ্যে বড় ধরনের বাদানুবাদ ও গোল বাঁধে। পূর্বঘোষিত রুট পরিবর্তন করে পুলিশের নির্দেশমতো মূল মিছিলের পথ শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে সরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশের যুক্তি ছিল, গত সপ্তাহে যেসব বাণিজ্যিক এলাকায় ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছিল, সেই স্পর্শকাতর এলাকাগুলোর কাছ দিয়ে মিছিলটি অতিক্রম করলে পুনরায় বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বামপন্থী রাজনীতিবিদদের তীব্র অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে রুট পরিবর্তন করার ফলে সাধারণ বিক্ষোভকারীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে এবং মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনকারীদের শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।
প্যারিসের প্রধান বিক্ষোভে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে নেতৃত্ব দেন দেশটির প্রভাবশালী বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ। এ সময় তিনি বিক্ষোভকারীদের সার্বিক সংযমের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সরকারের কঠোর নীতির কড়া সমালোচনা করেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ফ্রান্সের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট সমাধানে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর সরকার যদি অবিলম্বে কার্যকর ও জনবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে এই আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং তা থামবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ২০২৭ সালের ১৮ এপ্রিল এবং ২ মে ফ্রান্সের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ঠিক তার আগে দেশজুড়ে এই লাগাতার বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সংঘাত ফরাসি রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র উত্তাপ ছড়াচ্ছে, যা বর্তমান ম্যাখোঁ সরকারের জন্য বড় এক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



