ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনের সশস্ত্র সংগঠন হুতি বিদ্রোহীদের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা জারির প্রভাবে চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি ও ওমরাহযাত্রী। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা সংকটের কারণে বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবগামী মোট ১৪৪টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ফ্লাইট বাতিলের এই বিশাল ধাক্কায় চরম ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন অন্তত ২২ হাজার ২১ জন যাত্রী।
বিমানবন্দর সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ৬৭টি সরাসরি (ডাইরেক্ট) ফ্লাইট এবং ৭৭টি বিভিন্ন দেশের ট্রানজিট ফ্লাইট রয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি রিয়াদ বিমানবন্দর আংশিক চালুর কথা জানিয়েছে, তবে বাংলাদেশ থেকে এই রুটে নিয়মিত সময়সূচি অনুযায়ী কবে নাগাদ ফ্লাইট চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটে গত ১০ অক্টোবর। ওই দিন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের অত্যন্ত ব্যস্ত 'কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর'-কে লক্ষ্য করে ভয়াবহ হামলা চালায় ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ১৩ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন ৩ শতাধিক মানুষ। এই প্রাণঘাতী ঘটনার পরপরই অত্যন্ত জরুরিভিত্তিতে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ। প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর, আজ রোববার থেকে রিয়াদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে। জানানো হয়েছে, আপাতত টার্মিনাল-১ দিয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট এবং টার্মিনাল-২ দিয়ে সৌদি জাতীয় বিমান সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হবে। তবে পুনরায় চালুর ঘোষণার পরও হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এই বিমানবন্দরটিকে 'সামরিক লক্ষ্যবস্তু' হিসেবে আখ্যা দিয়ে সেখানে সাধারণ মানুষকে যাতায়াত না করার নতুন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাতিল হওয়া ৬৭টি সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে রয়েছে:
-
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস: ২৮টি ফ্লাইট
-
সৌদিয়া এয়ারলাইনস: ১৯টি ফ্লাইট
-
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস: ১০টি ফ্লাইট
-
রিয়াদ এয়ার: ১০টি ফ্লাইট
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য ও প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ৭৭টি ট্রানজিট ফ্লাইটও বাতিল করতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
-
ইন্ডিগো (ভারত): ৩০টি ফ্লাইট
-
এমিরেটস (ইউএই): ১৪টি ফ্লাইট
-
কাতার এয়ারওয়েজ: ৯টি ফ্লাইট
-
ফ্লাইদুবাই: ৮টি ফ্লাইট
-
এয়ার ইন্ডিয়া: ৮টি ফ্লাইট
-
সালামএয়ার: ৭টি ফ্লাইট
-
ইজিপ্টএয়ার: ১টি ফ্লাইট
নিরাপত্তা পরিস্থিতির মারাত্নক অবনতি হওয়ায় দেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ইতোমধ্যেই ২৩, ২৪ ও ২৫ অক্টোবরের ঢাকা-দাম্মামগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। পাশাপাশি ঢাকা-রিয়াদ রুটের নিয়মিত সকল ফ্লাইট আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ রাখার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। তবে প্রবাসী কর্মীদের স্বস্তির খবর হলো, ঢাকা থেকে জেদ্দা ও মদিনাগামী ফ্লাইটগুলো এখনও পর্যন্ত নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চালু রাখা হয়েছে।
ফ্লাইট বাতিলের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন সৌদিতে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকরা। অনেকেরই ভিসার মেয়াদ শেষের পথে, আবার কারও ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন অনেকেই। পাশাপাশি অনেক ওমরাহযাত্রী হোটেল বুকিং ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি শেষ করেও শেষ মুহূর্তে যাত্রা করতে পারেননি। এয়ারলাইনসগুলোর টিকিটিং কাউন্টার ও বিমানবন্দরে নতুন ফ্লাইটের শিডিউল বা রি-ইস্যুর জন্য প্রতিদিন ভিড় করছেন হাজারো যাত্রী।
রিয়াদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রশাসন উভয়ই সৌদিগামী যাত্রীদের বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে। বলা হয়েছে, ট্রাভেল এজেন্সি বা সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের নিকট থেকে ফ্লাইটের বর্তমান অবস্থা ও বুকিং নিশ্চিত না হয়ে কোনো অবস্থাতেই যেন যাত্রীরা বিমানবন্দরে এসে ভিড় না জমান। বাংলাদেশ থেকে রিয়াদ ও দাম্মামগামী সকল যাত্রীকে সার্বক্ষণিক বিমান সংস্থাগুলোর সর্বশেষ নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



