ছবি: সংগৃহীত
দেশের ব্যাংক খাতে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছে। প্রচলিত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো দেশে মাইক্রোফাইন্যান্স বা ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করছে সরকার। এসব ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান ও সার্বিক তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক—বাংলাদেশ ব্যাংককে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এনজিওভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক কাঠামোর আওতায় আসতে যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ লক্ষ্যে প্রণীত ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক খসড়ায় যেখানে অনুমোদিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল, সেখানে চূড়ান্ত খসড়ায় উভয় অঙ্কই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। নতুন খসড়া অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ৫০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, এই পরিশোধিত মূলধনের ৬০ শতাংশ আসবে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা-শেয়ারমালিকদের কাছ থেকে এবং বাকি ৪০ শতাংশ যোগান দেবেন উদ্যোক্তারা। তবে ব্যাংকটি পরিচালিত হবে সামাজিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে। অর্থাৎ লাভের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচন হবে এই ব্যাংকের মূল লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের লাইসেন্সিং ও তদারকির জন্য মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) আওতায় আলাদা একটি দপ্তর গঠনের চিন্তা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতেই এই দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে করে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা।
গেল সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে অধ্যাদেশটির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। খসড়া চূড়ান্ত করার আগে সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হয়। পাশাপাশি অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতও আলাদাভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষে উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন মিললে এটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হবে।
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে আরও সুচারু ও কার্যকরভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যেই এই নতুন ব্যাংক কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না। অর্থাৎ এর শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কেনাবেচার সুযোগ থাকবে না।
বর্তমানে দেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে মূলত বিভিন্ন এনজিও। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৬৮৩টি ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালাচ্ছে। নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে লাইসেন্সের আবেদন করতে হবে এবং এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রেও ব্যাংক কোম্পানি আইন প্রযোজ্য হবে। তবে লাইসেন্স পাওয়ার আগে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ভৌগোলিক কার্যক্রমের দিক থেকেও খসড়ায় নমনীয়তা রাখা হয়েছে। এক বা একাধিক জেলা, এক বা একাধিক বিভাগ কিংবা পুরো বাংলাদেশজুড়ে—এই তিন ধরনের এলাকায় ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ থাকবে। ফলে উদ্যোক্তারা নিজেদের সক্ষমতা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রমের পরিধি নির্ধারণ করতে পারবেন।
প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ হবে ১০ সদস্যের। এর মধ্যে চার জন পরিচালক হবেন ঋণগ্রহীতা-শেয়ারমালিকদের মনোনীত নির্বাচিত প্রতিনিধি। তিন জন পরিচালক হবেন এমন শেয়ারমালিকদের প্রতিনিধি, যারা নিজেরা ঋণগ্রহীতা নন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক দুজন স্বতন্ত্র পরিচালক মনোনয়ন দেবে, যাতে তদারকি ও সুশাসন নিশ্চিত করা যায়। পদাধিকারবলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পর্ষদের সদস্য থাকবেন, তবে তাঁর ভোটাধিকার থাকবে না।
নীতিনির্ধারকদের মতে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক চালুর মাধ্যমে এনজিওভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তদারকির ফলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তবে নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের স্বার্থ রক্ষায় সতর্ক থাকার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



