ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের আকাশে জমে থাকা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আর নানামুখী ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কালো মেঘ অবশেষে কাটতে শুরু করেছে। একের পর এক নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের পর সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখন পুরোদমে নির্বাচনি মাঠে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) নিবন্ধিত প্রায় সব দলের প্রার্থীরা এখন নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন এবং কৌশল নির্ধারণে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তারা। সব মিলিয়ে দেশজুড়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
শোককে শক্তিতে রূপান্তর: মাঠে নামছে বিএনপি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আকস্মিক মৃত্যুতে দেশজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে সাত দিনের এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তিন দিনের শোক পালন করায় নির্বাচনি প্রচারণায় কয়েক দিনের জন্য স্থবিরতা দেখা দেয়। এর আগে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বীরোচিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘিরেও নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।
তবে গত বুধবার বেগম জিয়ার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। বৃহস্পতিবার থেকেই প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, "আমরা নেত্রীর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে চাই। এই শোক জাতি বিনির্মাণে আমাদের অনুপ্রেরণা দেবে।" এরই মধ্যে বিএনপি ৪১ সদস্যের শক্তিশালী নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নজরুল ইসলাম খান এবং রুহুল কবির রিজভী। দলটির প্রার্থীরা এখন প্রতীক বরাদ্দের অপেক্ষায় আছেন এবং কঠোরভাবে নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলার অঙ্গীকার করেছেন।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বের যবনিকা
নির্বাচন নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে জনমনে নানামুখী ভীতি ও গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তব চিত্র এখন ভিন্ন:
-
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন: সবচেয়ে বড় গুজব ছিল তারেক রহমান দেশে ফিরবেন না। কিন্তু গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরে সব জল্পনা থামিয়ে দেন।
-
ড. ইউনূসের সদিচ্ছা: প্রধান উপদেষ্টা ক্ষমতা ছাড়বেন না—এমন তত্ত্বও হালে পানি পায়নি। ড. ইউনূস বারবার স্পষ্ট করেছেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়াই তার মূল লক্ষ্য।
-
ভারতের অবস্থান: ভারত নির্বাচন হতে দেবে না বলে যে প্রচারণা চালানো হয়েছিল, তা নস্যাৎ হয়ে গেছে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের মাধ্যমে। বেগম জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের শোকবার্তা এবং তারেক রহমানের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
-
আন্তর্জাতিক সমর্থন: যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক মহল একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ধোঁয়াশাও কেটে গেছে।
জামায়াত ও এনসিপির অবস্থান
নির্বাচনি মাঠে জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত সক্রিয়। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, তফসিল ঘোষণার পর এখন আর ভোট নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে তিনি সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনের আরও কঠোর ভূমিকা দাবি করেছেন। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনে করছে, যারা নির্বাচন হবে না বলে গুজব ছড়িয়েছিল, তারা মূলত অভ্যুত্থানের নেতাদের বিতর্কিত করতে চেয়েছিল। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের মতে, যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পথে থাকায় এখন ষড়যন্ত্রের কোনো সুযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের অভিমত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, "১৭ বছর পর দেশের মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কোনো অপপ্রচারই এখন ভোটারদের আটকাতে পারবে না। প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতি এবং নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা প্রমাণ করে যে, দেশ একটি স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।"
রাজনৈতিক সহাবস্থানের নতুন ইঙ্গিত
রাজনীতিতে বইছে নতুন হাওয়া। বৃহস্পতিবার রাতে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি আগামী ৫ বছরের জন্য দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলগুলোর মধ্যে এই সমঝোতা ও আলোচনার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দূর করতে সহায়ক হবে।
বর্তমানে সারা দেশে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়গুলোতে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই চলছে। আগামীকাল রোববার এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর প্রতীক বরাদ্দ পেলেই শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। রাজিব আহসান, জিকে গউছ এবং মতিউর রহমান আকন্দের মতো প্রার্থীরা এখন পুরোপুরি এলাকাভিত্তিক সংযোগে মন দিয়েছেন। সব মিলিয়ে দেশ এখন ভোটের জ্বরে কাঁপছে, যেখানে ষড়যন্ত্র নয়—বরং গণতন্ত্রই হতে যাচ্ছে প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



