ছবি: সংগৃহীত
দেশের মোবাইল ফোন বাজারে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম ও জালিয়াতির এক ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা চালুর পর দেখা গেছে, দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে বর্তমানে লাখ লাখ ক্লোন বা নকল হ্যান্ডসেট সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি মাত্র আইএমইআই (IMEI) নম্বর ব্যবহার করেই সচল আছে প্রায় ৪ কোটি ডিভাইস।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। সরকারের এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জালিয়াতির গভীরতা এতটাই বেশি যে সাধারণ ব্যবহারকারীরা অজান্তেই বড় ধরনের ডিজিটাল ও শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
৩ কোটি ৯১ লাখ ডিভাইসের একই পরিচয়!
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, বিগত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধুমাত্র একটি আইএমইআই নম্বর— '99999999999999' ব্যবহার করে নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হয়েছে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি বিভিন্ন কম্বিনেশন (Document ID+MSISDN+IMEI)। এটি যেমন মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে ঘটেছে, তেমনি বিভিন্ন আইওটি (IoT) ডিভাইস বা সিসিটিভি ক্যামেরার ক্ষেত্রেও হতে পারে। যেহেতু মোবাইল অপারেটররা মোবাইল এবং অন্যান্য সিম-সংযুক্ত ডিভাইসের আইএমইআই আলাদা করতে পারে না, তাই এই বিশাল সংখ্যাটি সামগ্রিক জালিয়াতির একটি খণ্ডচিত্র মাত্র।
রিপোর্টে উঠে এসেছে আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য:
-
৪৪০MDE০১৫২০২০- এই আইএমইআই নম্বরে সচল আছে সাড়ে ১৯ লাখ ডিভাইস।
-
৩৫২২৭৩MDE১৭৩৮৬৩৪- এই নম্বরে আছে সাড়ে ১৭ লাখ ডিভাইস।
-
শুধুমাত্র '০' (শূন্য) ডিজিটের আইএমইআই নম্বরে সক্রিয় আছে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি ফোন।
-
এছাড়াও ১ লাখের বেশি ডিভাইস সচল আছে এমন ফেক ও ডুপ্লিকেট আইএমইআই নম্বরের দীর্ঘ তালিকা পাওয়া গেছে।
নিরাপত্তাহীনতায় লাখ লাখ নাগরিক
এই বিপুল সংখ্যক নকল হ্যান্ডসেট কখনো কোনো স্বীকৃত নিরাপত্তা বা গুণগত মান পরীক্ষা (যেমন: Specific Absorption Rate বা SAR Testing) পার করেনি। ফলে এসব ফোন থেকে নির্গত রেডিয়েশন জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। সরকার আপাতত জনদুর্ভোগ এড়াতে এসব ফোন বন্ধ করছে না, তবে এগুলোকে ‘গ্রে’ (Grey) ক্যাটাগরিতে ট্যাগ করা হবে।
বিশেষ সহকারী তার পোস্টে উল্লেখ করেন, "লাখ লাখ নাগরিক এই নিম্নমানের ও নকল ফোন ব্যবহার করছেন। জনজীবনে অসুবিধা তৈরি হয় এমন কোনো কঠোর পদক্ষেপে সরকার এখন যাবে না, তবে অনিবন্ধিত ও ক্লোন ফোনের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা জরুরি।"
অপরাধ ও ডিজিটাল জালিয়াতির স্বর্গরাজ্য
নকল ফোনের এই ছড়াছড়ি কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি অপরাধীদের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান:
-
ডিজিটাল জালিয়াতি: দেশের ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতিই ঘটে অনিবন্ধিত ও অবৈধ ডিভাইসের মাধ্যমে।
-
e-KYC জালিয়াতি: ২০২৩ সালে ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি (e-KYC) জালিয়াতির ৮৫ শতাংশই হয়েছে অবৈধ বা পুনঃপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে।
-
ফোন চুরি: ২০২৩ সালে প্রায় ১.৮ লাখ ফোন চুরির রিপোর্ট হলেও এর বাইরে কয়েক লাখ চুরির ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। অবৈধ ফোনের ডাটাবেজ না থাকায় এসব সেট উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ
সরকার এখন বৈধভাবে আমদানিকৃত আইওটি (IoT) ডিভাইসগুলোকে আলাদাভাবে ট্যাগ করার কাজ শুরু করেছে। আন-অফিসিয়াল ফোনের আড়ালে নকল ফোনের যে নজিরবিহীন প্রতারণা চলছে, তাতে লাগাম টানতে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষ সহকারী। দেশের ৪টি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে এই বিশাল সংখ্যার অবৈধ ফোন সচল থাকায় এগুলোকে শৃঙ্খলায় আনা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এনইআইআর সিস্টেমের পূর্ণ কার্যকারিতা এবং আইএমইআই ডেটাবেজ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



