ছবি: সংগৃহীত
বিগত সরকারগুলোর ভুল যোগাযোগ নীতি এবং গণপরিবহন খাতের চরম বিশৃঙ্খলার কারণে দেশের সড়কগুলোতে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাড়ে ১২ বছরে দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন যাত্রী ও পথচারী। একই সময়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে চিরতরে পঙ্গু বা গুরুতর আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস সামনে রেখে এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
নৌ ও রেলপথের অবহেলায় সড়কের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ
সংগঠনটির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী নৌ এবং রেলপথকে ক্রমান্বয়ে অবহেলা করার খেসারত দিচ্ছে দেশ। স্বাধীনতার আগে নৌপথে দেশের সিংহভাগ মানুষ যাতায়াত করত, এরপর ছিল রেলের অবস্থান। এই দুটি গণমাধ্যম মিলে দেশের মোট যাত্রীর ৮০ শতাংশ পরিবহন করত। মাত্র ২০ শতাংশ যাত্রী সড়কপথ ব্যবহার করতেন।
পরবর্তী সময়ে রেল ও নদীপথের সক্ষমতা বৃদ্ধি না করে পুরো পরিবহন কৌশলকে সড়ককেন্দ্রিক করে তোলা হয়। ফলে বর্তমানে দেশের প্রায় পুরো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা অনিরাপদ সড়কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা ক্রমান্বয়ে দুর্ঘটনার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তৃণমূল থেকে মহাসড়ক: দুর্ঘটনার নানা অনুঘটক
সংগঠনটি তাদের পর্যবেক্ষণে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য একাধিক অনুঘটককে দায়ী করেছে:
-
অবকাঠামোগত সংকট: মহাসড়কগুলোতে ডিভাইডার না থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে গাছপালার কারণে দৃশ্যমানতা হ্রাস এবং সড়ক নির্মাণে কারিগরি ত্রুটি।
-
ছোট যানের আধিপত্য: মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং সিএনজি অটোরিকশার বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিত চলাচল মহাসড়কের শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ বিনষ্ট করছে।
-
আইন অমান্য ও চাঁদাবাজি: সড়কে চাঁদাবাজি, উল্টো পথে গাড়ি চালানোর প্রবণতা, ট্রাফিক আইনের শিথিল প্রয়োগ এবং অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বহনের প্রতিযোগিতা।
-
চালকদের পেশাগত অনিশ্চয়তা: নিয়মিত বেতন না থাকা, চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকায় বিরামহীন ও ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো।
-
নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা: বিআরটিএ-র সক্ষমতার অভাব, নামকাওয়াস্তে ফিটনেস সনদ প্রদান এবং অদক্ষ ও লাইসেন্সহীন চালকদের সড়কে চলাচলের সুযোগ দেওয়া।
সংগঠনটি উল্লেখ করে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা বহুগুণ বেশি, যা দেশের প্রধান হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর জরুরি বিভাগের ভর্তি রেজিস্টার পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সড়ক খাতের সুরক্ষায় দরকার টেকসই সংস্কার
সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও একটি নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি সমন্বিত সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে প্রধান হলো:
-
প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ নির্ভরতা: আন্তর্জাতিক পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে সড়ক পরিবহন খাত ও বিআরটিএ পরিচালনা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা চালু করা।
-
বাস নেটওয়ার্ক ও ছোট যান নিয়ন্ত্রণ: সিএনজি, মোটরসাইকেল বা ব্যাটারিচালিত যানের ওপর নির্ভরতা কমাতে আধুনিক বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের মাধ্যমে গতিশীল গণপরিবহন চালু করা।
-
মহাসড়কের নিরাপত্তা: ব্যস্ত মহাসড়কগুলোতে পৃথক সার্ভিস লেন ও পথচারী পারাপারের সঠিক ব্যবস্থা রাখা, পর্যাপ্ত রোড সাইন ও রোড মার্কিং দেওয়া এবং নিয়মিত 'রোড সেফটি অডিট' সম্পাদন করা।
-
শ্রমিকদের অধিকার ও অবকাঠামো: চালকদের বেতন ও ডিউটি টাইম নির্ধারণ করে দেওয়া, কঠোর প্রক্রিয়ায় যোগ্যতা যাচাই করে লাইসেন্স প্রদান এবং চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের জন্য ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা।
আমূল পরিবর্তন ও নীতিগত সংস্কার ছাড়া সড়কের এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



