ছবি: সংগৃহীত
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, আওয়ামী লীগের ক্ষমতার দম্ভ চূর্ণ হয়ে বহু শীর্ষ নেতা ও ক্যাডার বাহিনীর সদস্য এখন জেলে কিংবা পলাতক। তবে রাজধানীর মিরপুরে দৃশ্যপট ভিন্ন। ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের আগেও যে ১৭ তলাবিশিষ্ট ‘মিরপুর সিটি সেন্টার’ ভবনটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের নামে দখলে রাখা হয়েছিল, সরকার পতনের পরও তা একই সন্ত্রাসী ও দখলদার চক্রের কবজায় রয়েছে। ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের দায় মাথায় নিয়ে ভবনটির নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘এজি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড’ এখন সুবিচারের আশায় প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে ৩০ কাঠা জমির ওপর এই আধুনিক বাণিজ্যিক ভবনটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তিনটি বেইজমেন্টসহ ১৭ তলাবিশিষ্ট এই ভবনের মূল মালিক হায়দার আলী খান বহুলুলসহ মোট চারজন। অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে জমিদাতাদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করে নির্মাণকাজ শুরু করে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এজি প্রপার্টিজ লিমিটেড। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন করে ২০১৩ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।
তবে কাজ শুরু করার পরপরই একের পর এক ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র সামনে আসতে থাকে। এজি প্রপার্টিজ জানতে পারে, জমির মালিকরা তাদের সাথে চুক্তি করার বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রেখে তার আগেই ‘অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসেট ডেভেলপমেন্ট’ নামের অপর একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে—জমি মালিক পক্ষ ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অজান্তে মোট তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পক্ষের সাথে গোপনে একই জমি নিয়ে চুক্তি সম্পাদন করে। ফলে জমি সংক্রান্ত আইনগত জটিলতা ও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে যথাসময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘসূত্রতায় প্রথম থেকেই চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় এজি প্রপার্টিজ।
এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ২০২০-২১ সালের মহামারি করোনার কঠিন পরিস্থিতিতেও নির্মাণকাজ সচল রাখে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি। ভবন দ্রুত শেষ করার তাগিদে তারা দুটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে। ২০২১ সালে যখন তিনটি বেইজমেন্টসহ ১৭ তলার নির্মাণকাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ হয়ে আসে, তখনই ভবনটি দখলের জন্য বেপরোয়া হয়ে ওঠে জমিদাতা হায়দার আলী খান বহুলুল ও শওকত আলী খান বিপুলসহ চারজন মালিক।
বাণিজ্যিক ভবনটি জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণে নিতে সেখানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয় স্থাপন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের একটি সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীকে সাথে নিয়ে জমিদাতারা ভবনে হামলা চালায়। তারা এজি প্রপার্টিজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্মমভাবে মারধর করে ভবন প্রাঙ্গণ থেকে তাড়িয়ে দেয়।
হায়দার আলী খানের রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস ছিলেন তার শ্বশুর মনির চৌধুরী। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মাদারীপুর জেলার সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এবং মাদারীপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। এই মনির চৌধুরীর আপন চাচাতো ভাই ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক চিফ হুইপ নূরে আলম লিটন চৌধুরী। এই চরম রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল আমিনের সাথে অসাধু যোগসাজশ করে অবৈধভাবে এজি প্রপার্টিজের ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ বা আমমোক্তারনামা বাতিল করানো হয়।
ভবন থেকে উচ্ছেদ করার পর এজি প্রপার্টিজের ওপর নেমে আসে চরম চাঁদাবাজির খড়্গ। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের নিকট ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চরম বাধ্য হয়ে ও নিরুপায় অবস্থায় এজি প্রপার্টিজ ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা চাঁদা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়। আমমোক্তারনামা বাতিলের পর ডেভেলপারদের সাথে করা মূল চুক্তির তোয়াক্কাই করছে না মালিকপক্ষ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পতনের পরও মাফিয়া কায়দায় ভবনটির ওপর দখলদারিত্ব ও ভয়ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে চক্রটি।
বর্তমানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের যে অংশটি আইনগতভাবে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য এবং তারা যেসব ভাড়াটিয়ার কাছে স্পেস ভাড়া দিয়েছিল, তাদের কাছ থেকেও জোরপূর্বক ভাড়া আদায়ের পাঁয়তারা চালাচ্ছে জমি মালিকপক্ষ। আইনজ্ঞরা এই কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ব্যাংকের দেড় শ কোটি টাকার ঋণের পাহাড়, বিনিয়োগকৃত বিপুল অর্থ এবং ক্রেতাদের অমানবিক ভোগান্তির কারণে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে এজি প্রপার্টিজ। এই অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন অন্যায়ের অবসান ঘটাতে ভুক্তভোগী ক্রেতা ও ডেভেলপার কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



