ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে এরই মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে কারা বিরোধী দল হচ্ছে। স্বাধীনতার পর এই প্রথম বিরোধী দলের আসনে বসছে জামায়াতে ইসলামী। এর আগে তিনটি সংসদে জাতীয় পার্টি এবং এর আগের সংসদে বিএনপি বিরোধী দলে থাকলেও তারা ছিল দুর্বল। যে কারণে ওই সংসদগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের উপস্থিতির ফলে সরকারের সব কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। সংসদে জনগণের কথা তুলে ধরে সরকারকে কল্যাণকর ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে চালিত করতে ভূমিকা রাখেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা। তবে এ দেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরোধী দলের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের রেকর্ড থাকলেও গত তিনটি সংসদে বিরোধী দল কার্যত ছিল অনুপস্থিত। স্বল্পসংখ্যক আসন নিয়ে জাতীয় পার্টি সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ ভূমিকা রেখেছে।
এর আগে নবম সংসদে বিএনপি বিরোধী দলে থাকলেও আসনস্বল্পতার কারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তবে অষ্টম সংসদে বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগের সরব উপস্থিতি ছিল। এবার ত্রয়োদশ সংসদে ওই সময়ের চেয়েও শক্তিশালী বিরোধী দলের দেখা মিলবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সংসদে একটি কার্যকর বিরোধী দল থাকা জরুরি।
কিন্তু দেশে বিগত কয়েকটি সংসদে অনুগত বিরোধী দল, গৃহপালিত বিরোধী দল এবং একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলে অবস্থান নেওয়া বিরোধী দল দেখা গেছে। গণতান্ত্রিক চর্চা বিকাশের ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না। তবে এবারের নির্বাচনে সেই পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন নিয়ে যারা বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে, তারা সংসদকে কার্যকর করতে যথাযথ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে বিরোধী দলের আসনে বসছে জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া ছয়টি আসন বিজয়ী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), একটি করে আসনে জয়ী ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল ও কয়েকজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন।
তথ্য মতে, সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের এক মাসের মধ্যে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে। এর আগেই দলীয় সদস্যদের ভোটে বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতা নির্বাচিত হবেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তা স্পিকারকে জানানো হবে। স্পিকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করবে সংসদ সচিবালয়।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২(১)(ট) ধারা অনুযায়ী, ‘বিরোধী দলের নেতা অর্থ স্পিকারের বিবেচনা মতে যে সংসদ সদস্য সংসদে সরকারি দলের বিরোধিতাকারী সর্বোচ্চসংখ্যক সদস্য লইয়া গঠিত ক্ষেত্রমত দল বা অধিসংঘের নেতা।’ কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী বিরোধী দলের স্বীকৃতির বিষয়টি স্পিকারের একক এখতিয়ারের বিষয়। তবে রেওয়াজ অনুযায়ী, সরকারি দলের পর যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই দলই প্রধান বিরোধী দল এবং সেই দলের নেতা বিরোধীদলীয় নেতার মর্যাদা লাভ করেন।
সংসদ সচিবালয়ের তথ্যানুযায়ী, বিগত ১২টি সংসদের মধ্যে প্রথম ও ষষ্ঠ সংসদে কোন বিরোধী দল ছিল না। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়েছিল। ষষ্ঠ সংসদে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। এর আগে দেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রথম দৃশ্যমান হয় ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে। ওই সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে এবং বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের নেতা আসাদুজ্জামান খাঁন।
১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭৬টি আসনে জয়ী হয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে এবং শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। ক্ষণস্থায়ী ওই সংসদ ভেঙে দিয়ে ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই সংসদে সম্মিলিত বিরোধী দলের নেতা হন আ স ম আবদুর রব। এরপর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে এবং ১৮ আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। এই সংসদে আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসে এবং শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এটি এ দেশের সবচেয়ে কার্যকর সংসদ হিসেবে পরিগণিত হয়।
১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। আর বিএনপি ১১৬টি আসন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে। এই সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বেগম খালেদা জিয়া। এরপর ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। এই সংসদে মাত্র ৫৮টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের নেতার আসনে বসেন শেখ হাসিনা। এই সংসদেও বিভিন্ন ইস্যুতে সরব ছিল বিরোধী দল। নবম জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। বিএনপি মাত্র ৩০টি আসনে জয়ী হয়। এর পরের তিনটি জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি ডামি বিরোধী দলের ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিত্ব ছিল।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



