ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব, দুর্নীতিবাজদের প্রার্থী হওয়া এবং সম্পদের মিথ্যা হলফনামা দাখিল ঠেকাতে এবার নজিরবিহীনভাবে মাঠে নামছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘আটঘাট বেঁধে’ বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে সংস্থাটি, যার মাধ্যমে একদিকে চলমান অনুসন্ধান ও তদন্তের গতি বাড়ানো হবে, অন্যদিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সরাসরি নজরদারি চালানো হবে।
দুদকের একাধিক সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে সংসদ সদস্য প্রার্থীদের মধ্যে বিপুল অপ্রদর্শিত অর্থের ব্যবহার, হলফনামায় সম্পদের ভুল বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগ সামনে আসছে। এসব অনিয়ম রোধ করতে কমিশন এবার কেবল ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আগাম নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ভূমিকায় নামতে চায়।
১৫টি বিশেষ টাস্কফোর্স
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গত রোববার দুদক ১৫টি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। প্রতিটি দলে একজন করে উপপরিচালককে দলনেতা করা হয়েছে। ১৫টি দলে মোট ৯০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন—প্রতিটি দলে দুজন সহকারী পরিচালক, দুজন উপসহকারী পরিচালক এবং একজন করে কনস্টেবল বা সাপোর্টিং স্টাফ যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি দল ছয় সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান ইউনিট হিসেবে কাজ করবে।
দুদকের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, কমিশনের ৩৫/২০২৫ নম্বর সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনুসন্ধান ও তদন্ত শাখা, বিশেষ তদন্ত এবং মানি লন্ডারিং ইউনিটের সব চলমান অনুসন্ধান কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান দ্রুত নিষ্পত্তি এবং জটিল মামলায় সমন্বিতভাবে কাজ করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
দলভিত্তিক অনুসন্ধান—নতুন কৌশল
দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে সংস্থার কাজের ধরনে মৌলিক পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, “আগে অনুসন্ধান বা তদন্তের দায়িত্ব ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে দেওয়া হতো। ফলে অনেক কর্মকর্তার কাছে একসঙ্গে অসংখ্য ফাইল থাকত। এতে কাজ ধীরগতির হতো এবং জবাবদিহি কম থাকত। এখন দলভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়ায় প্রতিটি অনুসন্ধানের পেছনে পুরো টিম কাজ করবে। এতে গতি বাড়বে, দায়বদ্ধতা বাড়বে এবং হয়রানি কমবে।”
তিনি আরও বলেন, এই পদ্ধতির ফলে কোনো একটি মামলাকে ‘চাপা দেওয়া’ বা ‘লম্বা করা’ কঠিন হবে, কারণ দলে একাধিক কর্মকর্তা থাকবেন এবং সবাই পরস্পরের কাজ দেখবেন।
নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশেষ নজর
দুদকের আরেক কর্মকর্তা বলেন, টাস্কফোর্স মূলত দুদকের সামগ্রিক অনুসন্ধান ও তদন্ত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্যই গঠন করা হয়েছে। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি বিশেষভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, “এবার আমরা শুধু দুর্নীতি হওয়ার পর ধরার চেষ্টা করব না। যারা দুর্নীতিবাজ, যারা কালো টাকার মালিক এবং যারা মিথ্যা হলফনামা দিয়ে প্রার্থী হতে চায়—তাদের আগেই চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে।”
তার মতে, যদি এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে কয়েকজন বড় দুর্নীতিবাজকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া যায় বা আইনের আওতায় আনা যায়, তাহলে সেটাই হবে দুদকের বড় সাফল্য।
অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিও কমবে
টাস্কফোর্স ব্যবস্থার আরেকটি বড় সুবিধা হিসেবে দুদকের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা বৃদ্ধির কথা বলছেন সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা। একজন কর্মকর্তা বলেন, “একটি দলে পাঁচজন অফিসার থাকায় কেউ একা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। যদি কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে কিছু করতে চান, অন্যরা সেটা ধরে ফেলতে পারবেন। এতে দুদকের ভেতরের দুর্নীতির সুযোগ কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে।”
যাঁরা নেতৃত্বে
এই ১৫টি টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে রয়েছেন দুদকের ১৫ জন উপপরিচালক। অনুসন্ধান ও তদন্ত শাখা-১-এর নেতৃত্বে আছেন মো. হাফিজুল ইসলাম ও মো. রাশেদুল ইসলাম। শাখা-২-এর নেতৃত্বে মো. আতিকুর আলম। মানি লন্ডারিং শাখায় দায়িত্ব পেয়েছেন মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. মশিউর রহমান, আল-আমিন, তাহসিন মুনাবিল হক ও নেয়ামুল আহাসান গাজী। লিগ্যাল বা মানি লন্ডারিং শাখার একটি দলে নেতৃত্বে রয়েছেন মো. রওফুল ইসলাম। বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্তের ছয়টি দলের নেতৃত্বে আছেন মো. জয়নাল আবেদীন, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মোজাম্মেল হোসেন, এ কে এম মাহবুবুর রহমান, তানজীর হাসিব সরকার ও সিফাত উদ্দিন।
দুদক চেয়ারম্যানের বক্তব্য
নির্বাচনকালীন ভূমিকা নিয়ে দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন বলেছেন, সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ বেশি আসে। কারণ, উন্নয়ন প্রকল্প ও রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে তারাই সরাসরি যুক্ত থাকেন। তিনি বলেন, “যদি উন্নয়নের অর্থ নিয়ে টানাটানি শুরু হয়, তাহলে দুর্নীতির অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেই আসবে। আমরা আমাদের দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করছি।”
প্রার্থীদের হলফনামা নিয়ে তিনি বলেন, “আমরা অন্যান্য কাজ কমিয়ে হলেও নির্বাচনকেন্দ্রিক নজরদারি চালাতে চাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো—স্বল্প সময়ে সব হলফনামা খুব সূক্ষ্মভাবে যাচাই করা কঠিন। তাই নির্বাচন কমিশন বা গণমাধ্যম যদি কোনো অসংগতি তুলে ধরে, সেটি আমাদের কাজ সহজ করবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।”
কালো টাকার বিরুদ্ধে অবস্থান
ড. আব্দুল মোমেন আরও বলেন, “আমাদের লক্ষ্য একটি ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্র গঠন। আমরা চাই না অপ্রদর্শিত সম্পদের মালিকরা দেশ শাসন করুক। যারা কালো টাকার জোরে সংসদে যেতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান নেব।”
সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনে দুদকের এই টাস্কফোর্স কার্যক্রম কেবল দুর্নীতির তদন্ত নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্বচ্ছতা ফেরানোর একটি বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই কঠোর নজরদারি বাস্তবে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



