ছবি: সংগৃহীত
চলতি বছরের শুরু থেকেই বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা অনেক বিশ্লেষকের মতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সংকেত বহন করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক সামরিক বিরোধ নয়; বরং এটি এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, পণ্য পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশ্বায়নের যুগে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে কোনো একটি অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের অন্য অংশেও। মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। এখানকার অস্থিরতা মানেই তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা, আর তা সরাসরি প্রভাব ফেলে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, কৃষি এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর থেকে বের হয়ে আরব সাগরে যাওয়ার এই সরু নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে। একই সঙ্গে কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশও এই পথ ব্যবহার করে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। ফলে এই প্রণালি ঘিরে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাবে ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল–এর দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে দ্রুত বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৩ থেকে ৮৪ ডলারের ঘরে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি। অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি যুদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে এবং হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক নৌচলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতি এক ধরনের ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর দিকে ধাবিত হতে পারে। অর্থাৎ একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার মতো দ্বৈত সংকট তৈরি হতে পারে। এর আগে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২২ সালে বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। অনেক দেশ তখনো সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ঠিক সেই সময়েই নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা বিশ্ব বাজারে আরও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়, তার কোনো কার্যকর বিকল্প পথ নেই। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে সরবরাহের বড় ঘাটতি দেখা দেবে।
ইরানের পক্ষ থেকে প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বীমা কোম্পানিগুলোও এই রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এই পথ ব্যবহারকারী জাহাজের বীমা কভারেজ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে জাহাজ পরিবহন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে এবং অনেক কোম্পানি বিকল্প রুট বা পরিবহন ব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং ভোক্তা পর্যায়ে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন মডেল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ মাত্র ১ শতাংশ কমে গেলেই দাম প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সেই হিসাবে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে তেলের দাম বর্তমানের তুলনায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়বে প্লাস্টিক, রাসায়নিক শিল্প, সার উৎপাদন এবং রান্নার গ্যাসের বাজারেও। কৃষি খাতে সারের দাম বেড়ে গেলে খাদ্য উৎপাদনের খরচও বাড়বে, যার ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঢেউ সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শুধু তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাতারের কিছু উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম সাময়িকভাবে সীমিত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে এশিয়ার অনেক দেশ, বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই সংকট বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গত কয়েক বছরে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোর মতো কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু নতুন করে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি পেলে আবারও মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে। সেই ক্ষেত্রে সুদের হার আরও বাড়ানো হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন দ্বিধায় রয়েছে—মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে নাকি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাঁচিয়ে রাখবে।
বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো এই সংকটে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্য তাদের জ্বালানি ও খাদ্যের বড় একটি অংশ আমদানির ওপর নির্ভর করে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে এসব দেশের শিল্প উৎপাদন এবং গৃহস্থালির জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে স্পট মার্কেটে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতির এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশগুলো কতটা প্রস্তুত। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়ালে ভবিষ্যতে এমন সংকটের প্রভাব কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত যদি দ্রুত সমাধান না হয় এবং কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দার মুখে পড়তে পারে। সেই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে স্থিতিশীলতা বজায় না থাকলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সূত্র: ব্লুমবার্গ, টাইম ও গার্ডিয়ান
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



