ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের ২৮.৩ শতাংশই বাতিল। আর বৈধ প্রার্থীর হার ৭১.৭ শতাংশ। গতকাল রবিবার যাচাই-বাছাই শেষে এ তথ্য জানা গেছে। সারা দেশে ৫১টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে তিন হাজার ৪০৬টি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়।
এর মধ্যে প্রার্থী ছিলেন দুই হাজার ৫৬৮ জন। তাঁদের মধ্যে এক হাজার ৮৪২ প্রার্থীর প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে। আর বাতিল করা হয়েছে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র। তাঁদের মধ্যে সদ্যঃপ্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার তিনটি মনোনয়নপত্র সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
আজ সোমবার থেকে বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আপিল করতে পারবেন। অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও এনসিপির নেতারাও। কুড়িগ্রামে প্রার্থিতা বাতিল নিয়ে হট্টগোল হয়েছে। কোন কোন এলাকায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
আবার কোন কোন জেলায় তাঁদের মনোনয়নপত্র বৈধতা পেয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা আপিল করলে মনোনয়নপত্রের বৈধতা পাবেন। এবারের যাচাই-বাছাইয়ের সময় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আসনের মোট ভোটারের ১ শতাংশের স্বাক্ষর নিতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য, লাভজনক পদে থেকে নির্বাচন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের স্বাক্ষর সংক্রান্ত জটিলতা, দ্বৈত নাগরিকত্ব বা ঋণখেলাপি হলে তাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং অফিসাররা।
রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের পরিস্থিতি : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে ৩০০ আসনের বিপরীতে ৩৩১টি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়।
এর মধ্যে সদ্যঃপ্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার তিনটি মনোনয়নপত্র ছিল। তিনি মৃত্যুবরণ করায় ওই তিনটি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ছাড়াই কার্যক্রম সমাপ্ত করা হয় বলে নির্বাচন কমিশন জানায়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কিছু আসনে জোটকে ছাড় দিয়ে ২৭৬ আসনে ২৭৬ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মাঝে পাঁচজনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে জামায়াতের প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ মনোনয়ন ফিরে পেয়েছেন। গতকাল নতুন করে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং অফিসার। এ ছাড়া এনসিপি থেকে জমা দেওয়া ৪৬ প্রার্থীর মধ্যে তিনটি ছাড়া বাকি সবাই প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে। গণসংহতি আন্দোলনের ১৮ প্রার্থীর মধ্যে ১৬ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হয়েছে। দুজনের বাতিল হয়েছে। তাঁরা আপিল করবেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও দলের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল জানান, তাঁদের দলীয় প্রতীক মাথাল মার্কায় প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন।
যে চিত্র দেখা গেল : মনোনয়নপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে ময়মনসিংহ জেলায়। জেলায় ১১টি আসন রয়েছে। আসনগুলোর ৯৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৯ জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলায় ৬৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৮ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় দুটি আসনে ১১ জন প্রার্থীর মধ্যে ১১ জনই বৈধ। এই ১১ জনের মধ্যে দুজন বিএনপি, দুজন জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনের তিনজন, এনসিপি একজন, এবি পার্টির দুজন, বাংলাদেশ কংগ্রেস মনোনীত একজন। ঢাকার ২০টি আসনে ২৩৮ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। তাঁদের মধ্যে বাতিল হয়েছে ৮১টি। বৈধ ১৬১টি।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শুরু করে রিটার্নিং অফিসাররা। গতকাল ছিল শেষ দিন। এই সময়ের মধ্যে দুই হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। সারা দেশে যাচাই-বাছাইয়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেক প্রার্থীই নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে মনোনয়নপত্র জমা দেন। সবচেয়ে অবাক করার মতো ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের একটি আসনে। সেখানে একজন প্রার্থী নিজেই নিজের প্রস্তাবকারী হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের তালিকায় এমন ব্যক্তির নাম ও স্বাক্ষর পাওয়া গেছে, যিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। যাচাই-বাছাইয়ের সময় মৃত ব্যক্তির নাম দেখে খোদ রিটার্নিং অফিসাররাও বিস্মিত। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী জাহাঙ্গীরের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এ নিয়ে সপ্তমবারের মতো তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হলো।
বাতিলের খাতায় যেসব হেভিওয়েট : কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে জাতীয় পার্টির (জাপা) সাবেক মহাসচিব (বর্তমান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ পক্ষের জাপার নির্বাহী চেয়ারম্যান) মুজিবুল হক চুন্নুর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মোল্লার মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে রবিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় তাঁদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, পুলিশ সুপার এস এম ফরহাদ হোসেন, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোরশেদ আলম বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এর আগে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী, জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, বিএনপির বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ অনেকের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। গত সোমবার ঢাকার ২০টি আসনের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার মনোনয়ন বাতিল করেছে রিটার্নিং অফিসার।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বৈধতা পাবেন : গাইবান্ধা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাজেদুর রহমান একটি এমপিওভুক্ত স্কুলের শিক্ষক। গত শুক্রবার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং অফিসার। জামায়াতের যুক্তি হচ্ছে, এমপিওভুক্ত স্কুলের কলেজের শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এর আগেও এই পদে থেকে তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। এবার ইচ্ছাকৃতভাবে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘দেশের অন্য জায়গায় এমপিওভুক্ত অনেক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। আইনেও কোনো বাধা নেই। তার পরও গাইবান্ধায় আমাদের প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।’ এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গণমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, ‘এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান লাভজনক না। তার নিয়োগকর্তাও সরকার না। সুতরাং এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচন করতে পারবেন। তাঁদেরটা বাতিল হয়ে থাকলে তাঁরা মনোনয়ন ফিরে পাবেন।’ তাহলে এটি রিটার্নিং অফিসারদের পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ? এমন প্রশ্নের জবাবে এই কমিশনার বলেন, ‘আমি দেখলাম, একই কারণে নাটোরের প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ। কিন্তু গাইবান্ধায় বাতিল হলো। কেউ যদি খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে বাতিল করে থাকে, সেটি আমরা খতিয়ে দেখব।’
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছিল, ছোটখাটো ভুলের জন্য যেন মনোনয়ন বাতিল করা না হয়। এখানে নির্বাচন কমিশন ও রিটার্নিং অফিসারদের মধ্যে হয়তো কোনো একটা দূরত্ব আছে। তা না হলে এমন তো হওয়ার কথা নয়।’
নানা স্থানে প্রতিবাদ : দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগে প্রয়োজনীয় কাগজ না থাকায় কুড়িগ্রাম-৩ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র গতকাল রবিবার বাতিল ঘোষণা করে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়। বর্ধিত সময়ের পরও নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে না পারায় গতকাল এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা রিটার্নিং অফিসার কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণকক্ষের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার আবু বক্কর সিদ্দিক বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। জামায়াতের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের খবরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছেন জামায়াতের দুই শ থেকে আড়াই শ নেতাকর্মী ও সমর্থক।
বিপাকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা : স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ওই আসনের মোট ভোটারের ১ শতাংশ ভোটের স্বাক্ষরসহ তথ্য ইসিতে জমা দিতে হয়। গত কয়েক দিনে সারা দেশের যেসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে তাঁদের বড় একটা অংশই হচ্ছে স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া প্রার্থী। গত মাসের শেষ দিকে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন আলোচিত নারী প্রার্থী তাসনিম জারা। গত শনিবার ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে তা বাতিল ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার। জারা তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানান, বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়নপত্র গৃহীত হয়নি। যে কারণে রিটার্নিং অফিসারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করবেন তিনি। এরই মধ্যে আপিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
ঋণখেলাপি, দ্বৈত ভোটারসহ সারা দেশে যেসব কারণে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে তাঁর বড় একটি অংশ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের অনেককে ভোটারের স্বাক্ষরের গরমিলের কারণে মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



