ছবি: সংগৃহীত
রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো রাজস্ব। একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং জনগণের মৌলিক সেবা নিশ্চিতকরণ—সবকিছুর সঙ্গেই রাজস্ব আহরণের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই রাজস্ব আহরণের কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের অধীনে কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগ দেশের রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আদায়কৃত মোট রাজস্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসে কাস্টমস ও ভ্যাটের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম থেকে। এই বিশাল রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি হলো মাঠপর্যায়ে কর্মরত প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (ইন্সপেক্টর) ও রাজস্ব কর্মকর্তা (সুপারিনটেনডেন্ট)। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, উচ্চ কর্মচাপ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই নন-ক্যাডার কর্মকর্তারাই দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
আইন-বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ, শুল্ক ও কর ফাঁকি প্রতিরোধ, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম তদারকি, ভ্যাট আদায় নিশ্চিতকরণসহ বহুমুখী দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাঁরা প্রতিদিনই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অবদান রাখছেন। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট ছাড়াই অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ব্যয় করে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে এসব কর্মকর্তাকে। ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশে কাজ করা সত্ত্বেও তাঁদের পেশাগত জীবনে দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী বৈষম্য বিরাজ করছিল।
নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা বছরের পর বছর ধরে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, চাকরি স্থায়ীকরণ, সময়মতো পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেডে উন্নীতকরণ, চলতি দায়িত্ব থেকে নিয়মিতকরণ, পদায়ন এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছিলেন। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও শুধু ক্যাডার ও নন-ক্যাডার বিভাজনের কারণে তাঁদের অগ্রযাত্রা থমকে ছিল দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে।
এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক ছিল উপ-কমিশনার পদে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ না থাকা। উপ-কমিশনার পদে পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র সরাসরি ক্যাডার পদে যোগদানকারীদের এবং ডিপার্টমেন্টাল পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যেই পদোন্নতি সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা যুগের পর যুগ একই স্তরে থেকে পেশাগত হতাশা ও বঞ্চনার শিকার হন।
অবশেষে এই দীর্ঘদিনের বৈষম্যের অবসান ঘটলো ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ০৮.০০.০০০০.০০০.০৩৮.১২.০০১৩.২১.৭ নম্বর স্মারকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে উপ-কমিশনার পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়। এর মধ্য দিয়ে কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগে নন-ক্যাডার পর্যায়ে ৩৩ বছরের বৈষম্যের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটেছে।
এই পদোন্নতিকে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান এবং ন্যায়সংগত স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই ঐতিহাসিক পদোন্নতির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাকাভ)-এর পক্ষ থেকে মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা, সচিব, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, চেয়ারম্যান—জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সদস্য (কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন)সহ অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
বাকাভ নেতারা আশা প্রকাশ করেন, বৈষম্যমুক্ত কাস্টমস ও ভ্যাট পরিবার গঠনের এই উদ্যোগ এখানেই থেমে থাকবে না। ন্যায়সংগত পদোন্নতি, পেশাগত মর্যাদা এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা আরও উৎসাহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণে ভূমিকা রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে এটি একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



