ছবি: সংগৃহীত
২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নীতি সহায়তা প্রত্যাহারের প্রভাব একযোগে পড়ায় রপ্তানি আয়ের নিম্নমুখী ধারা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে চলতি অর্থবছর শেষে এই নেতিবাচক প্রবণতা আরও গভীর হতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বর সময়ে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ২৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ কম। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ডিসেম্বর মাসের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমেছে, যেখানে ২০২৪ সালের একই সময়ে এই আয় ছিল ৪ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। বছরের শেষ প্রান্তিকে এ ধরনের বড় পতন ভবিষ্যৎ প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
পোশাক খাতে চাপ অব্যাহত
জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রধান ভরসা তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতেও এই নেতিবাচক ধারা স্পষ্ট। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে এ খাতের রপ্তানি আয় ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিটওয়্যার রপ্তানি ১০ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা ৩ দশমিক ২২ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি ৯ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৮ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ ১ দশমিক ৯১ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এর ফলে পোশাকপণ্যের চাহিদা কমেছে এবং কাজের অর্ডারের প্রবাহ মন্থর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মার্কিন বাজারে আমরা ধারাবাহিকভাবে বড় ধরনের অর্ডার পতন দেখছি।”
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে চীন ও ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আক্রমণাত্মকভাবে প্রবেশ করছে এবং কম দামে পণ্য সরবরাহ করে বাংলাদেশের বাজার অংশ দখল করছে। “চীন ও ভারত তাদের রপ্তানিকারকদের শুল্কের ধাক্কা সামলাতে প্রণোদনা দিচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশ এলডিসি স্নাতক ও আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী বিভিন্ন সুবিধা ও প্রণোদনা কমিয়েছে, যা আমাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল করেছে,” যোগ করেন তিনি।
অন্যান্য খাতে মিশ্র চিত্র
পোশাক খাতের বাইরে কয়েকটি খাতে কিছুটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও সামগ্রিক চিত্র খুব আশাব্যঞ্জক নয়। হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানি সামান্য বেড়ে ২৫৪ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে চিংড়ি রপ্তানি ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বেড়ে ১৭৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ওষুধ খাতে ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতেও মোট রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ বেড়েছে, বিশেষ করে চামড়াজাত পণ্যে প্রায় ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। তবে কাঁচা চামড়া ও প্লাস্টিকপণ্য রপ্তানি কমেছে।
কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস দেখা গেছে। এই খাতে রপ্তানি আয় ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ কমে ৫৩৪ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।
বাজারভিত্তিক অবস্থান
ডিসেম্বর ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু বাজারে মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তবুও সামগ্রিকভাবে বড় বাজারগুলোতে অর্ডারের ধারাবাহিকতা দুর্বল।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো কয়েকটি উদীয়মান বাজারে তুলনামূলক ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা বাজার বৈচিত্র্যকরণের সম্ভাবনা দেখালেও প্রধান বাজারগুলোর দুর্বলতা পুষিয়ে দেওয়ার জন্য তা এখনো যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির কারণ
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বলছে, বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়া, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ, আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে রপ্তানি খাতে চাপ তৈরি হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বছরের শুরুতে রপ্তানির প্রবণতা কিছুটা ইতিবাচক থাকলেও বছরের শেষ দিকে তা স্পষ্টভাবে নেতিবাচক হয়েছে, যা ভালো লক্ষণ নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাবেই মার্কিন বাজারে আমাদের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।”
তার মতে, “একই সঙ্গে আমাদের প্রয়োজন দ্রুত ও বাস্তবসম্মত নীতি পদক্ষেপ। রপ্তানি বৈচিত্র্য, বাজার সম্প্রসারণ এবং শিল্প খাতে সহায়তা না বাড়ালে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।”
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি সমন্বয়, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার প্রভাবও রপ্তানিতে চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্ডার সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রপ্তানিকারক ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নবনির্বাচিত সরকার যদি দ্রুত নীতি সহায়তা, প্রণোদনা পুনর্বিবেচনা, বাজার বৈচিত্র্যকরণ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে পারে, তাহলে অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি সম্ভব। অন্যথায় চলতি অর্থবছর শেষে রপ্তানি খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন প্রধান আলোচ্য।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



