ছবি: সংগৃহীত
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর কথিত গ্রেফতার যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আবারও আলোচনায় এনেছে—কোন কোন বিশ্বনেতাকে সরাসরি বন্দি করেছে ওয়াশিংটন। অতীতেও কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র; তবে প্রতিটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
মাদুরোর এই ঘটনা তাকে এমন একটি তালিকায় যুক্ত করেছে, যেখানে আগে থেকেই আছেন ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এবং পানামার সাবেক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগার মতো নেতারা; যাদের গ্রেফতার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার (৩ জানুয়ারি) নিশ্চিত করেন যে, নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ব্যাপক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করা হয়েছে। পরে তাদের ভেনেজুয়েলা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো ক্ষমতাসীন বা সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাসরি আটক করেছে। তবে সেগুলোর প্রতিটিই সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক কাঠামো বদলে দিয়েছে।
ম্যানুয়েল নরিয়েগা: এক সময়ের মিত্র থেকে বন্দি
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে পানামায় আগ্রাসন চালায়। উদ্দেশ্য ছিল দেশটির সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করা। যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানের পক্ষে যুক্তি হিসেবে দেখায়— পানামায় বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা, অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং অবৈধ মাদক ব্যবসা।
পানামায় হামলার আগেই, ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ামিতে নরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে মামলা করে। ঠিক যেমনটি তারা নিকোলাস মাদুরোর ক্ষেত্রেও করেছে।
নরিয়েগা ১৯৮৫ সালে নিকোলাস আরদিতো বারলেত্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। ১৯৮৯ সালের নির্বাচন বাতিল করেন এবং অভিযানের আগে দেশে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবকে সমর্থন দেন।
পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান সে সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক অভিযান হিসেবে বিবেচিত হয়।
জেনারেল নরিয়েগা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশলের প্রতি আগের মতো অনুগত না থাকার লক্ষণ দেখাতে শুরু করলে ওয়াশিংটন তাকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে। পরে অভিযানে চালিয়ে তাকের আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে মিয়ামিতে দায়ের করা মামলায় বিচার করা হয়। তিনি সেখানে ২০১০ সাল পর্যন্ত কারাবন্দি ছিলেন। পরে তাকে আরেকটি মামলার বিচারের জন্য ফ্রান্সে প্রত্যর্পণ করা হয়। এক বছর পর ফ্রান্স তাকে আবার পানামায় পাঠিয়ে দেয়। পানামার কারাগারেই ২০১৭ সালে নরিয়েগার মৃত্যু হয়।
সাদ্দাম হোসেন: যুদ্ধের পরিণতি ও ফাঁসি
ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইনকে ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা গ্রেফতার করে। এর ঠিক নয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব শুরু হয়; যার পেছনে যুক্তি হিসেবে বাগদাদের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (ডব্লিউএমডি) থাকার অভিযোগ তোলা হয়। যে অভিযোগ পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
নরিয়েগার মতোই সাদ্দামও দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিলেন। বিশেষ করে ১৯৮০– এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়; যে যুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সে সময় তিনি ওয়াশিংটনের সমর্থন পেয়েছিলেন।
২০০৩ সালের যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র আরও দাবি করে— সাদ্দাম আল-কায়েদার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিতেন। যদিও এই অভিযোগেরও কোনো ভিত্তি ছিলো না।
মার্কিন আগ্রাসনের নয় মাস পর ধরা পড়েন সাদ্দাম হোসেন। তিনি নিজ শহর তিকরিতের কাছে একটি গর্তে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় আটক করা হন। পরবর্তীতে তাকে ইরাকের একটি আদালতে বিচার করা হয় এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার দণ্ড কার্যকর করা হয়।
হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ: গ্রেফতার থেকে ক্ষমা
হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের ঘটনাটিকে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতামূলক আচরণের একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করেন অনেক পর্যবেক্ষক।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় রাজধানী তেগুসিগালপায় নিজ বাসভবন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট ও হন্ডুরাসের নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযানে হার্নান্দেজকে গ্রেফতার করা হয়।
২০২২ সালের এপ্রিল মাসে তাকে দুর্নীতি ও অবৈধ মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়। একই বছরের জুনে একটি মার্কিন আদালত তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।
তবে নাটকীয়ভাবে, ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে ক্ষমা করে দেন।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই হন্ডুরাসের প্রধান কৌঁসুলি হার্নান্দেজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় সাবেক এই নেতাকে ঘিরে দেশটিতে নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র হয়ে ওঠে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



