ছবি: সংগৃহীত
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন অধ্যায় শুরুর আশা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা ও রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দিতে গতকাল বুধবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় আসেন। এই সফরে তিনি খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় তিনি তারেক রহমানকে লেখা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চিঠি পৌঁছে দেন।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যে গত সপ্তাহে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ঢাকায় জরুরি ভিত্তিতে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। গতকাল ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাতের সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ গতকাল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর শেষে ঢাকা ত্যাগের ছবি প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর চার ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফর শেষে ঢাকা ছাড়ার পর বাংলাদেশ ও ভারত পারস্পরিক স্বার্থ, বাস্তবভিত্তিক এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় রচনার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। এই বিষয়টি আজ বিকেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনায়ও উঠে আসে।
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দর্শন ও মূল্যবোধ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অংশীদারি উন্নয়নের পথ দেখাবে—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে এমন আস্থার কথা জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর। গতকাল ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে এক এক্স বার্তায় এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটিই প্রথম সফর।
এক্স বার্তায় জয়শঙ্কর লিখেছেন, ‘ঢাকায় পৌঁছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে পাঠানো একটি ব্যক্তিগত পত্র তাঁর হাতে তুলে দিয়েছি।’
তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর আরো লিখেছেন, ‘ভারত সরকার ও ভারতের জনগণের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছি। বেগম খালেদা জিয়ার দর্শন ও মূল্যবোধ আমাদের পারস্পরিক অংশীদারির উন্নয়নে পথপ্রদর্শক হবে—এই আস্থার কথা জানিয়েছি।’
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গতকাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার আগে জাতীয় সংসদ ভবনে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন।
এ সময় আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানায়, প্রতিবেশী দেশ ভারত বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকবার্তা পাঠিয়েছে। তাঁকে ‘গণতন্ত্রের জননী’ এবং ‘সাহস ও সংগ্রামের প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যিনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন ছিলেন।
জয়শঙ্করের সফর প্রসঙ্গে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ এক্স পোস্টে জানান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতন্ত্রে খালেদা জিয়ার অবদানের কথা বলেছেন।
বার্তা সংস্থা স্পুৎনিক জানায়, ভারেতর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরো জোরদার হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
এই সফরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের মধ্যে কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর শেয়ার করা ছবিতে জয়শঙ্করকে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যায়। তবে সফরকালে তাঁদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি।
ভারতীয় ও বাংলাদেশি সরকারি অ্যাকাউন্টে শেয়ার করা ছবির ভিত্তিতে জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে ঢাকায় উপস্থিত নেপাল ও ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাশাপাশি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকারের সঙ্গেও সৌজন্য বিনিময় করেন ভারতের শীর্ষ কূটনীতিক।
এর আগে গত মঙ্গলবার সকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করেন। মোদি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়নে এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ২০১৫ সালে ঢাকায় তাঁর সঙ্গে আমার উষ্ণ সাক্ষাতের কথা আমি স্মরণ করি। আমরা আশা করি, তাঁর দর্শন ও উত্তরাধিকার আমাদের অংশীদারিকে পথ দেখিয়ে যাবে।
১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তাঁর দেশে ফেরা প্রসঙ্গে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে গত শুক্রবার দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘আপনারা জানেন, ভারত বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে সমর্থন করে। এই অগ্রগতিকে সেই প্রেক্ষাপটেই দেখা উচিত।’
জয়শঙ্কর এগিয়ে এসে বললেন, আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি : পাকিস্তানের স্পিকার : যুদ্ধের পর এই প্রথম ভারত ও পাকিস্তানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের দেখা হলো ঢাকায়, খালেদা জিয়ার শেষযাত্রায়, কুশল বিনিময় করলেন তাঁরা। এ সময় কী কথা হয়েছে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে, সেই কথোপকথনের একটা বর্ণনা দিয়েছেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক।
চিরবৈরী দুই দেশের নেতাদের দেখা হয় গতকাল ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনে। সেখানে তাঁরা খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে পৃথকভাবে দেখা করে সমবেদনা জানান। পরে সন্ধ্যায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের এক্স পাতায় জয়শঙ্করের সঙ্গে সরদার আয়াজের হাত মেলানো ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের বর্ণনা দেওয়া হয়। পরে সেটি রিপোস্ট করেছেন স্পিকার নিজেই।
পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ লিখেছে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ পরিদর্শনে বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অতিথিদের উপস্থিতিতে প্রয়াত খালেদা জিয়ার জন্য শোকবইয়ে সই করেছেন স্পিকার সরদার আয়াজ। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জাতীয় পরিষদের স্পিকারের দিকে এগিয়ে আসেন এবং করমর্দন করেন। কথোপকথনের সময় জয়শঙ্কর নিজের পরিচয় দেন এবং স্পিকারকে বলেন, তিনি তাঁকে চিনতে পেরেছেন।
এক্স পোস্টে বলা হয়, ‘এটি ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তান-ভারত সংঘাতের পর ভারতের দিক থেকে শুরু করা প্রথম কোনো উচ্চ পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য মিথস্ক্রিয়া। এই বলা গুরুত্বপূর্ণ যে অতর্কিত আগ্রাসন ও উত্তেজনা প্রতিরোধে সংলাপ, সংযম ও সহযোগিতাপূর্ণ পদক্ষেপের কথা পাকিস্তান অব্যাহতভাবে বলে আসছে; যার মধ্যে শান্তি আলোচনা ও পেহেলগামে পাতানো ঘটনার অভিযোগের যৌথ তদন্তের বিষয়ও রয়েছে।’
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শেষে গত মে মাসের পর এটিই দুই দেশের সরকারের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সাক্ষাৎ। চিরবৈরী দুই দেশের সরকারি পর্যায়ের ব্যক্তিদের মধ্যে এমন চিত্র সাম্প্রতিক সময়ে বিরল। চলতি বছরের এপ্রিলে কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর দুই দেশের মধ্যে বিরোধ পৌঁছে চূড়ান্ত মাত্রায়। চিরবৈরী দেশ দুটির শীর্ষস্থানীয় এই দুই নেতার সাক্ষাতের ছবি ও কুশল বিনিময়ের খবর উভয় দেশের সংবাদমাধ্যমেও এসেছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



