ছবি: সংগৃহীত
গত বছর উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী দেশগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে এবং সম্পর্ক জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আজ সেই উষ্ণ আর্থিক সম্পর্ক হঠাৎ করে চাপের মুখে পড়েছে। গত শুক্রবার এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
দুবাইয়ের ব্যবসায়ী খালফ আল হাবতুর গত বৃহস্পতিবার এক্স পোস্টে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধের দিকে টেনে নেওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?’ তিনি বলেন, ট্রাম্প উপসাগরীয় দেশগুলোকে এমন এক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন, যা তারা বেছে নেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান যখন প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, তখন এই জ্বালানিসমৃদ্ধ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার আশঙ্কা একটি গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ওলটপালট করে দিতে পারে।
সাংবাদিক এলিয়ট ব্রাউন, জর্জি কাঞ্চেভ এবং লরেন থমাসের লেখা প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কাতার যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের জোয়ার বইয়ে দিয়েছিল। সাম্প্রতিক ইতিহাসে যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলনায় তারা ট্রাম্পকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এই তিন দেশের সম্মিলিত তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি বিনিয়োগের ঢল হিসেবে প্রচার করেছিলেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) থেকে শুরু করে গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা– ট্রাম্পের বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পে অর্থায়নের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছিল এই দেশগুলো।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র ফেলো র্যাচেল জিম্বা বলেন, ‘এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলোর সক্ষমতা ও আগ্রহ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।’ তিনি মনে করেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেল ও গ্যাস থেকে আয় কমে যাবে। দেশগুলো প্রতিরক্ষায় বেশি ব্যয় করতে বাধ্য হবে। ফলে বিদেশে বিনিয়োগ করার মতো অর্থ তাদের হাতে কম থাকবে।
দুবাইয়ের বিলিয়নেয়ার আল হাবতুরের এই মন্তব্য আমিরাতের অভিজাত শ্রেণির দীর্ঘদিনের সতর্ক অবস্থানের এক বিরল ব্যতিক্রম। আল হাবতুর গ্রুপ বিলাসবহুল হোটেল থেকে শুরু করে গাড়ি ব্যবসা এবং প্রকাশনা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল কনগ্লোমারেট।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কাতারের সরকার তাদের বিমানবন্দরের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে ইরানকে দায়ী করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালানোর আগেই উপসাগরীয় দেশগুলো এর বিরোধিতা করেছিল। তাদের ভয় ছিল, এতে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে।
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘ইরান সমর্থিত সন্ত্রাসবাদ শুধু আমেরিকার ক্ষতি করেনি, আমাদের মিত্রদেরও ক্ষতি করেছে। এই অভিযান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্য রক্ষার জন্যই চালানো হয়েছে।’
গত বছর হোয়াইট হাউসে ফেরার পরপর ট্রাম্প উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোকে সহযোগী হিসেবে পান। ২০২৫ সালের বসন্তে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে দেশগুলো তাঁকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও জমকালো নৈশভোজের মাধ্যমে স্বাগত জানায়। এরপর থেকে আর্থিক লেনদেন কেবল বেড়েছে। এর মধ্যে আবুধাবিতে ডিজনিল্যান্ড থিম পার্ক এবং কাতারের পক্ষ থেকে একটি বড় বিমান উপহার দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ট্রাম্পের পারিবারিক ব্যবসা এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও এই অঞ্চলে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও প্রাইভেট-ইকুইটি খাতে বেশ কিছু চুক্তি করেছেন। কাতার, জেদ্দা, রিয়াদ এবং দুবাইয়ে ট্রাম্পের নামে আবাসিক টাওয়ার ও বিলাসবহুল গলফ কোর্স তৈরির কাজ চলছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌম তহবিলগুলো বড় বড় কোম্পানি অধিগ্রহণের পেছনে রয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের ৫৫ বিলিয়ন ডলারে ভিডিও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ইলেকট্রনিক আর্টস’ কেনা এবং আবুধাবি তহবিলের ‘ক্লিয়ার চ্যানেল আউটডোর হোল্ডিংস’ অধিগ্রহণের চুক্তি উল্লেখযোগ্য। এই সংঘাত অর্থের প্রবাহকে কতটা প্রভাবিত করবে তা নির্ভর করছে এর ব্যাপ্তির ওপর।
তবে অর্থনীতিবিদরা ইতোমধ্যে এই অঞ্চলের পূর্বাভাস কমাতে শুরু করেছেন। ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, সংঘাত কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হলে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



