ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নীরবে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকার রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবেই ওয়াশিংটন এই কৌশল বেছে নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিশেষ করে ভারতের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, সম্প্রতি তাদের হাতে একটি ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিং এসেছে। ওই অডিওতে ঢাকায় নিযুক্ত এক মার্কিন কূটনীতিক কয়েকজন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ ও যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) ওই কথোপকথনের অডিওটি সংবাদমাধ্যমটির হাতে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ফাঁস হওয়া রেকর্ডিং অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সম্ভাব্য শক্তিশালী অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে ভালো ফলাফল করলে জামায়াতকে উপেক্ষা না করে তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশি সাংবাদিকদের অনুরোধ জানান, জামায়াতের শীর্ষ নেতারা এবং তাদের প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে মূলধারার গণমাধ্যমের আলোচনায় আরও বেশি জায়গা দেওয়ার জন্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী কার্যত নিষিদ্ধ ছিল এবং দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোও জামায়াতকে ঘিরে সতর্ক অবস্থানে ছিল। দলটির বিরুদ্ধে ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েমের প্রচেষ্টা, ধর্মীয় আইন জোরদার এবং নারীদের কর্মঘণ্টা সীমিত করার মতো অবস্থানের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। দলটি এখন নিজেদের দুর্নীতিবিরোধী, সংস্কারমুখী এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণে আগ্রহী একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। ওয়াশিংটন পোস্টের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আপাতত এই পুনর্ব্র্যান্ডিং প্রচেষ্টার প্রতি একটি সহনশীল ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
ফাঁস হওয়া অডিওতে মার্কিন কূটনীতিক ইসলামপন্থি শাসনব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে শক্তিশালী অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা রয়েছে। জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি যদি আদর্শিক সীমা অতিক্রম করে চরমপন্থার দিকে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপসহ কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর তৈরি পোশাক খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ওই কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, “যদি কোনো অর্ডার না থাকে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিও থাকবে না।” তিনি আরও বলেন, জামায়াত নির্বাচিত হলেও তারা শরিয়াহ আইন চালু করবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন। তবে একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি শরিয়াহ আইন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে পরদিনই বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে শতভাগ শুল্ক আরোপ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
অডিওতে আরও উঠে আসে, যুক্তরাষ্ট্র শুধু জামায়াতের সঙ্গেই নয়—হেফাজতে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গেও যোগাযোগের কথা বিবেচনা করছে। কূটনীতিকের ভাষায়, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক। কারণ আমরা চাই—আমাদের হাতে এমন সুযোগ থাকুক, যাতে আমরা ফোন দিয়ে বলতে পারি, ‘আমরা যা বলেছি, ঠিক সেভাবেই ব্যবস্থা নেব।’”
এই পুরো প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করছে ভারত। দিল্লি দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতে ইসলামিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে দেখে আসছে। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করে, জামায়াতের সঙ্গে পাকিস্তানের আদর্শিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন কৌশল ইতোমধ্যে নানা ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমীকরণে এই অবস্থান কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে—তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



