ছবি: সংগৃহীত
দেশের মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) খাতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর পারফরম্যান্সে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে আগের মাসের (জুলাই) তুলনায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর এমএফএস খাতের লেনদেন এক ধাক্কায় প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। লেনদেনের পাশাপাশি এই সেবার আওতায় থাকা গ্রাহক হিসাবের (অ্যাকাউন্ট) সংখ্যাতেও দেখা দিয়েছে বড় ধস। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এই খাত থেকে দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি হিসাব সক্রিয় তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বা কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর এমএফএস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মোট ১ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী মাস আগস্টে এসে সেই লেনদেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে লেনদেনের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা। কেবল আগের মাসের সাথেই নয়, বরং এক বছরের ব্যবধান হিসাব করলেও এই পতনের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত বছরের (২০২৫) আগস্ট মাসের তুলনায় এবার লেনদেন কমেছে ২৭১ কোটি টাকা বা ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে গ্রাহক হিসাবের দিকে তাকালে দেখা যায়, জুলাই মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর এমএফএস হিসাবের সংখ্যা ছিল ২৮ লাখ ৮০ হাজার ৩৭৪টি। কিন্তু আগস্ট মাসে তা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়ে ২৬ লাখ ৬০ হাজার ৮৮টিতে নেমে এসেছে। ফলে এক মাসে হিসাব কমেছে ঠিক ২ লাখ ২০ হাজার ২৮৬টি। তবে এক বছরের তুলনামূলক চিত্রে কিছুটা আশার আলো রয়েছে; গত বছরের আগস্টের তুলনায় বর্তমানে হিসাবের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার বৃদ্ধি পেয়েছে।
হিসাব ও লেনদেনের বিস্তারিত খাতের চিত্রে দেখা গেছে, আগস্ট মাসে নগদ জমা (ক্যাশ ইন) এবং নগদ উত্তোলন (ক্যাশ আউট)—উভয় খাতেই সার্বিক লেনদেন হ্রাস পেয়েছে:
-
নগদ জমা (ক্যাশ ইন): জুলাই মাসে ক্যাশ ইনের পরিমাণ ছিল ৩৪৪ কোটি টাকা, যা আগস্টে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২১২ কোটি টাকায়।
-
নগদ উত্তোলন (ক্যাশ আউট): আগস্টে ক্যাশ আউটের পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের মাস জুলাইয়ে ছিল ৫০৫ কোটি টাকা।
-
পিটুপি (P2P) লেনদেন: ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের পরিমাণ জুলাইয়ের ২৫ কোটি টাকা থেকে কমে আগস্টে হয়েছে ২১ কোটি টাকা।
-
বেতন বিতরণ: প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জুলাইয়ে যেখানে ৩১৮ কোটি টাকার বেতন বিতরণ করা হয়েছিল, আগস্টে তা নেমে এসেছে ১৯৪ কোটি টাকায়।
তবে এই মন্দা পরিস্থিতির মধ্যেও কেনাকাটার বিল পরিশোধ ও সরকারি ভাতা প্রদানের মতো দুটি খাতে ব্যতিক্রমী প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে:
-
মার্চেন্ট পেমেন্ট: জুলাই মাসে কেনাকাটার বিল পরিশোধ বাবদ ৪১৭ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল, যা আগস্টে বেড়ে ৪৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।
-
জিটুপি (G2P) লেনদেন: সরকার থেকে ব্যক্তিবর্গের অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ প্রদান বা জিটুপি লেনদেনে বড় ধরণের উল্লম্ফন ঘটেছে। জুলাইয়ের মাত্র ১৩ কোটি টাকার জিটুপি লেনদেন আগস্টে বেড়ে পৌঁছেছে ১০১ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর এই মোবাইল ব্যাংকিং সেবার অবস্থান এখনও বেশ নড়বড়ে ও সীমিত। তথ্য বলছে, এমএফএস হিসাব ও মোট লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই প্রচলিত (কনভেনশনাল) ব্যাংকগুলোর চেয়ে বহুগুণ পিছিয়ে রয়েছে তারা। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
-
গ্রাহক হিসাবের অংশ: দেশে মোট তফসিলি ব্যাংকের এমএফএস হিসাবের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ মাত্র ১ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিপরীতে প্রচলিত ব্যাংকগুলো এককভাবে ৯৮ দশমিক ২০ শতাংশ বাজার দখল করে রয়েছে।
-
মোট লেনদেনের অংশ: লেনদেনের বাজারের ব্যবধানটি আরও বিশাল। আগস্টের মোট তফসিলি ব্যাংকের এমএফএস লেনদেনে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল তলানিতে—মাত্র শূন্য দশমিক ০৮ শতাংশ। অপরদিকে বাকি ৯৯ দশমিক ৯২ শতাংশ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কেবল কাগজে-কলমে বা নথিপত্রে হিসাবের সংখ্যা বাড়ালেই এমএফএসের বাজার প্রসারিত হয়েছে বলা যায় না। ব্যাংকিং সেবায় সত্যিকার অর্থেই গ্রাহক যুক্ত হচ্ছে কি না, তা বুঝতে সক্রিয় হিসাবের সংখ্যা, দৈনিক ও মাসিক নিয়মিত লেনদেন এবং সাধারণ গ্রাহকদের প্রযুক্তিগত সেবা ব্যবহারে আগ্রহ কতটুকু—তা পর্যবেক্ষণ করা অপরিহার্য।
ইসলামী ব্যাংকগুলোকে দেশের এমএফএস খাতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে হলে বেশ কিছু কৌশলগত উন্নয়ন প্রয়োজন:
সেবার মান উন্নত করতে এবং নিরবচ্ছিন্ন পেমেন্ট নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
সাধারণ গ্রাহক যেন অতি সহজে ও কম খরচে অর্থ লেনদেন করতে পারেন, সেই সহজ লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা।
প্রান্তিক অঞ্চল পর্যন্ত এজেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যাপক হারে সম্প্রসারণ করা।
সর্বোপরি ব্যাংকিং সেবা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর গ্রাহকের আস্থা শক্তিশালী করা।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



