ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ভোটগ্রহণের পরবর্তী এক সপ্তাহ পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অপতথ্যের ৪৫ শতাংশই ছিল নির্বাচনসংক্রান্ত, যার সংখ্যা ৫২৮টি। শুরুতে নির্বাচন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না—এমন সন্দেহ উসকে দিয়ে অপতথ্য ছড়ানো হয়, আর শেষ দিকে ভোটে কারসাজির অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব তাদের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। দেশে কার্যরত ৯টি তথ্য যাচাইকারী সংস্থার ৭২ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। গত শনিবার এটি প্রকাশ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকালে ব্যাপকভাবে অপতথ্য ছড়িয়েছে—যার আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল। তবে তা মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি এবং এ বিষয়ে সংস্থাটির বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, অপতথ্য মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সব পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব না হলেও ন্যূনতম যে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, সেটিও দৃশ্যমান ছিল না; এমনকি অপতথ্য ছড়ালে কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারে—এই বার্তাটিও তারা স্পষ্টভাবে দিতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অপতথ্য মোকাবিলা বড় চ্যালেঞ্জ হবে এবং সেক্ষেত্রে উপজেলা ও থানা পর্যায়কে কেন্দ্র করে আগাম কঠোর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে।
ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ফল ঘোষণার পরের এক সপ্তাহ, অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমে ১ হাজার ১৮৫টি রাজনৈতিক অপতথ্য যাচাই করা হয়েছে। রিউমর স্ক্যানার, বুমবিডি, নিউজচেকার, ফ্যাক্ট ক্রিসেন্ডো, ফ্যাক্ট ওয়াচ, এএফপি বাংলাদেশ, আজকের পত্রিকা, ডিসমিসল্যাব এবং দ্য ডিসেন্ট মিলে এই অপতথ্যগুলো শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ৫২৮টি অপতথ্য আলাদা করে বিশ্লেষণ করেছে ডিসমিসল্যাব।
নির্বাচনী প্রচারের ১৯ দিনে প্রতিদিন ১১ থেকে ১২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। মনোনয়ন যাচাই–বাছাই পর্যায়ে এ হার ছিল প্রতিদিন গড়ে ৫টির কিছু কম। ভোটের দিন ২৪ ঘণ্টায় ছড়িয়েছে ২৬টি অপতথ্য। ভোটের পরের সপ্তাহে হার কিছুটা কমলেও প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়টি দাবি যাচাই করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে–পরে মিলিয়ে ৭২ দিনে গড়ে প্রতিদিন দুটির বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অপতথ্যের প্রায় ১২ শতাংশ ছিল এআই দিয়ে তৈরি। এর মধ্যে প্রতি ১০টির ৭টি ভিডিওভিত্তিক।
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ বলছে, ৫২৮টি নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অপতথ্যের মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণার ১৯ দিনে ছড়ানো হয়েছে ৪১ শতাংশ। প্রচার শেষ হওয়া এবং ভোটের মধ্যবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ৯৫টি অপতথ্য। শুধু ১১ ফেব্রুয়ারিই রাজনৈতিক ও নির্বাচন-নির্দিষ্ট মিলিয়ে ৭০টির বেশি দাবি যাচাই করা হয়, যা পুরো নির্বাচনী সময়ের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ।
নির্বাচনী সময়সূচি অনুযায়ী অপতথ্যগুলোকে ভাগ করেছে ডিসমিসল্যাব। তাদের পর্যবেক্ষণ হলো, নির্বাচনী কার্যক্রম শুরুর আগে ছড়ানো অপতথ্যে রাজনৈতিক বার্তাই প্রাধান্য পেয়েছে।মনোনয়ন গ্রহণ শুরুর পর অপতথ্যের কেন্দ্র সরে যায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক দাবিতে। কে নির্বাচন করবেন, কার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, আদৌ নির্বাচন হবে কি না—এসব প্রশ্ন ঘিরে গুজব ছড়ায়।
আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার পর অপতথ্যের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়; প্রার্থীদের নামে অতিরঞ্জিত বা মনগড়া প্রতিশ্রুতি ছড়ানো হয়, এআই-তৈরি সমাবেশের ছবিতে উপস্থিতির সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয় এবং পুরোনো বিক্ষোভ বা সহিংসতার ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে চলমান সংঘর্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, এবারের নির্বাচনে অপতথ্য বেশি ছড়ানোর আশঙ্কা ছিল এবং বাস্তবেও তা-ই হয়েছে। তবে তিনি এটিকে শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন এবং ভবিষ্যতের নির্বাচন সামনে রেখে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



