ছবি: সংগৃহীত
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে পা রাখছে নতুন সরকার। প্রধান থেকে শুরু করে সরকারের সব পর্যায়ে কর্মকাণ্ডের সূচনালগ্নেই এর আভাস মিলছে। দুর্নীতি রোধে এবার সরকারকে হার্ড লাইনে দেখা যাবে বলে সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তাও জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
দীর্ঘদিনের লালিত ‘ভিভিআইপি সংস্কৃতি’, ক্ষমতার দম্ভ এবং দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপকে উপড়ে ফেলতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নতুন সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকার কেবল নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক আচরণের মাধ্যমে এক নতুন রাজনৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করতে চাইছে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গড়তে কোনো আপস করা হবে না। এই ‘হার্ড লাইন’ অবস্থানের ফলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ-আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর এতিমখানা থেকে সচিবালয়—সবখানেই এখন পরিবর্তনের হাওয়া। সাধারণ মানুষ আশা করছে, এই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি কেবল শুরু নয়, এটিই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের স্থায়ী রূপ।
এরই মধ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন এতিমখানাগুলোর ওপরও বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে অনেক এতিমখানায় ৫০ জনের বরাদ্দের টাকা নিয়ে মাত্র ২৫ জনকে খাবার দেওয়া হতো এবং বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হতো।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এতিমদের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া যেকোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন পুলিশসহ সব অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, কোনো ধরনের ঘুষ বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। এই বার্তার প্রতিফলন দেখা গেছে সদ্য সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের কথায়ও।
গত রবিবার বিকেলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে ভার্চুয়াল সভায় আইজিপি বাহারুল আলম দেশের সব ইউনিটপ্রধান, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও জেলা পুলিশ সুপারদের কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে স্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বা মাদকসংক্রান্ত অপরাধে লিপ্ত থাকলে দল-মত-নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।’ বিশেষ করে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো তৎপরতা চলতে দেওয়া যাবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। মহাসড়কে ডাকাতি প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের এই পদক্ষেপ কেবল উচ্চ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। আমরা ব্যবসা করতে আসিনি, সার্ভিস দিতে এসেছি।’ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, তাঁর এই বক্তব্যে বর্তমান সরকারের জনসেবামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। তিনি গত রবিবার আরো বলেন, ‘কোনো দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বিষয়টি তাদের (বিএনপি) নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে। প্রতিটি সরকারকে ক্ষমতায় বসার পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখেছি; কিন্তু অতীতের সরকারগুলোকে সেটা বাস্তবায়ন করতে দেখা যায়নি। বর্তমান সরকার যদি বাস্তবায়ন করতে পারে সেটা ইতিবাচক দিক। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিএনপি ও গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর কারো কারো বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগের কথা শোনা গেছে। বিএনপি এখন সরকারে। তারা চাইলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব। এরই মধ্যে ইতিবাচক অনেক বিষয় আমরা দেখছি। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেগুলো আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি শুধু অর্থ আত্মসাৎ নয়, ক্ষমতার অপব্যবহারও এক ধরনের বড় দুর্নীতি। আড়ম্বর বর্জন এবং নাগরিক জীবনে বিঘ্ন না ঘটানোর মাধ্যমে বর্তমান সরকার প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা জনগণের সেবক হিসেবেই কাজ করতে আগ্রহী। রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দিক থেকে এসব পদক্ষেপের আর্থিক মূল্য হয়তো সীমিত, কিন্তু এর নৈতিক মূল্য অপরিসীম। এটি একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে যে নেতাদের জীবনযাপন হবে সাধারণ নাগরিকদের মতোই। তবে এই সংস্কারের সুফল পেতে হলে কেবল নেতৃত্বের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, বরং পুরো আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনিক কাঠামোয় এই চেতনা ছড়িয়ে দিতে হবে। যদি এই কঠোর অবস্থান এবং জনমুখী সংস্কার ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে, তবেই বাংলাদেশ একটি সত্যিকারের আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনীতিতে নেতারা সাধারণত বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু তার বাস্তবায়নে সাধারণ মানুষের সংশয় থাকে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত আচরণে যে পরিবর্তন এনেছেন, তা কেবল প্রতীকী নয়, বরং গভীর এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে যে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল ক্ষমতার দৃশ্যমান দাম্ভিকতা। সড়কে মন্ত্রীদের দীর্ঘ গাড়িবহর, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ রাখা এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলার সংস্কৃতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, ভিভিআইপি চলাচলের সময় সড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স আটকে রোগী মারা গেছে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারেনি। এই জনভোগান্তির অবসান ঘটাতে ভিভিআইপি প্রটোকলে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর আগে যেখানে ১২ থেকে ১৪টি গাড়ির সমন্বয়ে গঠিত হতো, এখন তা কমিয়ে মাত্র চারটি গাড়িতে নামিয়ে আনা হয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বা কোনো মন্ত্রীর চলাচলের সময় পুলিশ আর সড়ক বন্ধ করবে না। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে নাগরিকের জীবন থামিয়ে দেওয়ার যে অপসংস্কৃতি ছিল, তার অবসান ঘটিয়ে নাগরিক মর্যাদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো গাড়িতে জাতীয় পতাকার ব্যবহার সীমিত করা। প্রধানমন্ত্রী কেবল রাষ্ট্রীয় অতিথি বা বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের সফরের সময় গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করবেন। নিয়মিত চলাচলের সময় গাড়িতে কোনো পতাকা থাকবে না। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, জাতীয় পতাকা কোনো ব্যক্তির একক সম্পত্তি নয়, এটি সমগ্র জাতির। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বলয় ভেঙে রাষ্ট্রকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার এটি একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
সরকারের কর্মপদ্ধতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে বলে অনেকের ধারণা। সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তার মতে, আগে বেশির ভাগ মন্ত্রিসভা বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলেও এখন থেকে তা সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। এটি প্রশাসনকে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা থেকে বের করে এনে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রয়াস। এ ছাড়া নানা কাজে দীর্ঘসূত্রতা ও ফাইলজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী নিজে শনিবারও দাপ্তরিক কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমলাতন্ত্রের অলসতা কাটাতে এবং সাধারণ মানুষের সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এটি একটি বড় উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের তরুণসমাজ যে আন্দোলনের সূচনা করেছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, মর্যাদাশীল ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন। তারা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন চায়নি, চেয়েছিল শাসনব্যবস্থার আমূল সংস্কার। তারেক রহমানের এই প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো সেই তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকেই ধারণ করছে।’
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



